আপনি দীর্ঘদিন ধরে অনুবাদ করছেন এবং অধিকাংশই বাংলা থেকে ইংরেজিতে। অনুবাদক হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই...
পারভীন ইলিয়াস : আমার সাহিত্যপাঠের শুরুর দিকে রাশিয়ান, ফরাসি, জার্মান এবং সুইডিশ লেখকদের সাহিত্যকর্ম পাঠ করার সুযোগ হয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল মূলত তাদের সাহিত্যকর্ম ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হওয়ায়। ফলে অনুবাদের গুরুত্বটা উপলব্ধি করেছিলাম। এর পাশাপাশি আমার মনে হয়েছিল, অনুবাদকরা নানান দেশের সংস্কৃতির ব্যাপারে লক্ষ্য ভাষার পাঠকদের অবহিত করে থাকেন। না হলে মানুষের কাছে অন্য সংস্কৃতি অজানাই থেকে যেত।
একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের সাহিত্য তো তারই সংস্কৃতির প্রতিফলন। এ রকম একটি সাহিত্য অন্য একটি ভাষায় অনূদিত হলে লক্ষ্য ভাষার পাঠক সুযোগ পান উৎস ভাষার সংস্কৃতি জানার। এভাবে বিভিন্ন ভাষাভাষীর গণমানুষের একটি মানসিক মেলবন্ধন সৃষ্টি করে অনুবাদ। এই সবই অনুবাদে আমার সম্পৃক্ত হওয়ার মূল কারণ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সাহিত্যকর্মের অনুবাদ পাঠকের মনকে অবাধ এবং ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
অনুবাদের জন্য আপনি কীভাবে টেক্সট নির্বাচন করেন? এর নেপথ্যে কি কোনো বিশেষ মানদণ্ড কাজ করে?
পারভীন ইলিয়াস : অনুবাদের জন্য গল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার নির্দিষ্ট কোনো ছক বা বাঁধাধরা নিয়ম নেই। ধরো, যখন মুক্তিযুদ্ধের ওপর গল্প অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন বিভিন্ন গল্পসংকলন নিবিড়ভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। সেখান থেকে সেসব গল্পই বেছে নিয়েছি যেগুলো ভাষার লালিত্যে অনন্য, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় সমৃদ্ধ এবং যুদ্ধের সেই তীব্র ট্রমা ও ভয়াবহতার এক জীবন্ত রূপকল্পও তুলে ধরে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গল্পের সাহিত্যিক উৎকর্ষ এবং পাঠককে আলোড়িত বা উদ্বেলিত করার সহজাত ক্ষমতা। আমার অবশ্য কয়েকজন পছন্দের কথাসাহিত্যিক আছেন। যেমন—কায়েস আহমেদের লেখার আমি ভীষণ অনুরাগী এবং তার বেশ কিছু গল্প অনুবাদও করেছি। এ ছাড়া হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শওকত আলীর সাহিত্যকর্ম আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
অনুবাদকর্মে স্বাধীনতার পরিধি ঠিক কতটুকু বলে আপনি মনে করেন? আর মূল রচনার প্রতি বিশ্বস্ততা কীভাবে বজায় রাখেন?
পারভীন ইলিয়াস : অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল পাঠের অন্তর্নিহিত চেতনাকে ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আদি লেখার প্রতি বিশ্বস্ত থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মূল রচনাটি যদি কোনো আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হয়, তাহলে সাংস্কৃতিক সূক্ষ্ম রূপান্তর বা দ্যোতনা ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আঞ্চলিক ভাষার সেই রসসিক্ত স্বাদ, তার চতুর বিদগ্ধতা এবং সহজাত কৌতুকবোধকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্কৃতির পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া একজন অনুবাদকের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ঠিক এই জায়গাটায় এসে মূল লেখার ষোলো আনা স্বাদ প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতা ও একরাশ হতাশা একজন অনুবাদককে গভীরভাবে তাড়িত করে। আবার কখনো কখনো লেখকের নিজস্ব গদ্যশৈলী বা বর্ণনাভঙ্গিও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠতে পারে। যেমন—আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দীর্ঘ ও জটিল বাক্যে লিখতেন, যা রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো, আর তার আখ্যানে থাকে নানা বিষয় ও অঞ্চলের অবলীলা বিচরণ। অন্যদিকে শহীদুল জহিরের লেখা মানেই যতিচিহ্নের ন্যূনতম ব্যবহার আর অনুচ্ছেদহীন নিরেট পৃষ্ঠার একেকটি জমাট অবয়ব। তবে আমি বলব, গভীর দায়বদ্ধতা আর উদ্দেশ্যের সততা থাকলেই কেবল এই সমস্ত দুর্লঙ্ঘ্য বাধা পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
আপনার অফ হোপস অ্যান্ড ড্রিমস-এ যে গল্পগুলো নির্বাচন করেছেন, এই গল্পগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবন এবং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের কথা বলে। বইটি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন...
পারভীন ইলিয়াস : হ্যাঁ, বইটির গল্পগুলো এদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত। যে কথাশিল্পীদের গল্প বইটির জন্য নির্বাচন করেছি, তারা বাস্তবতার প্রতি অটল থেকে প্রান্তিক ও নিপীড়িত মানুষের জীবনকে তাদের গল্পে চিত্রিত করেছেন। মূলত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সব স্তরের শ্রেণিবৈষম্য, দরিদ্রদের নিপীড়ন এবং শোষণ—এসবই প্রকটভাবে উঠে এসেছে গল্পগুলোতে। যেমন—সাধারণ মানুষের জীবনকে যে সামাজিক-রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো প্রভাবিত করেছে, সেসব ঘটনা হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোতে এসেছে। খেয়াল করো, যুবতি কাকন কিন্তু একটি স্থিতিশীল পারিবারিক একতার স্বপ্ন দেখে। এদিকে শরণার্থী হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে নয় মাসের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা পার করার পর দেশে ফিরে এসে রামশরণ আশা করে সে নিজের বাড়িটি খুঁজে পাবে। এই সবই হলো মানুষের মৌলিক আশা এবং স্বপ্ন। কায়েস আহমেদ আবার লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম এবং একটি স্বাধীন দেশের জন্য তাদের আশা ও স্বপ্নের কথা।
ম্যাম, ইলিয়াসের গল্পগুলোর ব্যাপারে যদি বলতেন...
পারভীন ইলিয়াস : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার সাহিত্যকর্মে প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে; সেসব শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ, যাদের বেঁচে থাকার লড়াইতেই ফুরিয়ে যায় সমস্ত জীবনীশক্তি। শবেবরাতের রাতে কবরস্থানের বাইরে ভিড় করে থাকা টোকাই আর ভিখারিদের টিকে থাকার কৌশলগুলোর মধ্য দিয়ে মূলত শহরের হতদরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামের কূটকৌশলই মূর্ত হয়ে ওঠে। আবার হাবিবুল্লাহর দাফনের জন্য ইলিয়াস যখন পাঠককে গ্রামের সেই গোরস্তানে নিয়ে যান, তখন তিনি নিশ্চিত করেন যেন পাঠকের মনে হয় তিনি এক আস্তাকুঁড়ে প্রবেশ করছেন—যেখানে কেবল গরিবের লাশই ছুড়ে ফেলা হয়। সেখানে বন্য শেয়ালের খুঁড়ে ফেলা কবর থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর মলমূত্রের উৎকট দুর্গন্ধে পাঠক এক তীব্র বিবমিষায় আক্রান্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর সাতটি গল্প গ্রন্থটিতে অন্তর্ভুক্ত করলেন। এই গল্পগুলো অনুবাদ করার সময় অনুবাদক হিসেবে কোনো তাড়না অনুভব করেছিলেন?
পারভীন ইলিয়াস : এই সংকলনের বহু গল্পই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। এই মহান যুদ্ধ তো বাংলাদেশের মানুষের জীবনকেই আমূল বদলে দিয়েছে এবং উপহার দিয়েছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই আমি সম্পূর্ণ নিজস্ব তাগিদেই এই গল্পগুলো অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো, সেই নয় মাসের বাস্তব চিত্র বিদেশি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। একজন গল্পকার অবশ্য সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কেবল খণ্ডচিত্রই ফোটাতে পারেন। তবে আমি এমন কিছু গল্প এখানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছি, যার প্রতিটি গল্পই আমাদের স্বাধীনতার সামষ্টিক সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে উন্মোচিত করে।
বিদেশি ভাষায় বাংলা সাহিত্যকর্মের অনুবাদের ব্যাপারে কী বলবেন? কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ খুবই কম হয়। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
পারভীন ইলিয়াস : হ্যাঁ, বিদেশি ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের খরাটা রয়েই গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো, যদিও বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরে ইংরেজিই একমাত্র দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শেখানো হয়, দুর্ভাগ্যবশত, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তরে এই শিক্ষার মান অত্যন্ত দুর্বল ও নড়বড়ে। এমনকি উচ্চতর শ্রেণিতেও ইংরেজি শিক্ষাদানের পরিধি মোটেও পর্যাপ্ত নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু এই ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে যে হিমশিম খায় তাই নয়, তাদের মধ্যে ইংরেজির প্রতি এক ধরনের ভীতিও কাজ করে। ফলে অনুবাদের জন্য যে সাবলীলতা ও ভাষার ওপর দখল প্রয়োজন, তা গড়ে ওঠে না।
আরেকটি বড় কারণ হলো, যারা ইংরেজিতে তুলনামূলকভাবে দক্ষ এবং হয়তো কিছুটা লিখতেও পারেন—যেমন ইংলিশ মিডিয়াম বা ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা—বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাদের অনুরাগ বা পড়ার আগ্রহ একেবারেই কম। অনেক সময় তারা নিজেদের মাতৃভাষার গভীরতার মুখোমুখি হতেই দ্বিধাবোধ করেন। ফলে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার মতো সাহিত্যিক অনুবাদের অনুকূল পরিবেশটি এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
বাংলা সাহিত্যকর্ম বিদেশি ভাষায় যা কিছু অনূদিত হচ্ছে তার সংখ্যা ও গুণগত মানে কি আপনি সন্তুষ্ট?
পারভীন ইলিয়াস : এটা বলতেই হয়, এখানে ইংরেজিতে অনুবাদের এক ধরনের প্রয়াস আছে। তবে তার প্রাচুর্য ও গুণগত মান আজও সন্তোষজনক নয়। অনুবাদ মূলত উৎস ও লক্ষ্য—উভয় ভাষাতেই অনুবাদকের অগাধ পাণ্ডিত্যের দাবি রাখে আর এই যুগলবন্দি প্রকৃতপক্ষেই এক দুর্লভ সংযোগ। অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল রচনার প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততা রক্ষা করা অপরিহার্য হলেও বহু ক্ষেত্রে অনুবাদকরা সাংস্কৃতিক সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সম্পর্কে অসচেতন থাকেন এবং দ্যোতনা অনুধাবনে ব্যর্থ হন। ফলে যা হয় : অর্থের অপলাপ ঘটে। অনুবাদের বেলায় তো বটেই, ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আগ্রাসী ব্যবহারও আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। যন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত শ্রমকে নিজের সৃষ্টি বলে দাবি করার মধ্যে এক চরম নৈতিক স্খলন নিহিত রয়েছে। অনুবাদকর্মে এআই ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এখন সময়ের দাবি এবং একই সঙ্গে এমন এক তদারকি প্রযুক্তি গড়ে তোলা আবশ্যক, যা এর অনভিপ্রেত ও অনৈতিক অপব্যবহার রোধ করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পলকের ব্যবধানে একটি অবয়ব দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় সত্যি। কিন্তু এআইর দ্বারা জয়েস, মার্কেস, সালমান রুশদী বা ইলিয়াসের যথাযথ অনুবাদ সম্ভব বলে মনে করেন?
পারভীন ইলিয়াস : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও বলব এর রয়েছে কিছু সহজাত সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে সাহিত্য সৃষ্টির ব্যাপারে। সেটা দস্তয়ভস্কির সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই হোক কি ইলিয়াসের সমষ্টি অবচেতনের বিবরণই হোক, কিংবা হোক সে মারকেসের জাদুবাস্তবতার স্বাভাবিক আবহ—এসব এআই ওদের মতো করে আনতে পারবে কী করে? এসবই সম্পর্কিত ব্যক্তি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, সৃষ্ট চরিত্রের স্বতন্ত্র মানবিক অনুভব, ভাবাবেগ এবং দার্শনিক বিবেচনার সঙ্গে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর, কিন্তু ব্যক্তি লেখকের বুদ্ধিমত্তা, চরিত্রের মনজগতের আনাচে কানাচে তার প্রবেশের ক্ষমতা, তার সঙ্গে একাত্মতাবোধ, তার সুখে সুখী, দুখে দুখী হওয়ার ক্ষমতা, এক কথায় তার গভীর ভাবাবেগগুলো সমভাবে কিংবা জৈবিকভাবে অনুভব করার ক্ষমতা সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেই। এ জন্যই তো সে কৃত্রিম।
ম্যাম, আপনি এবং স্যার দুজনই অনুবাদক। আপনি বাংলা সাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইংরেজি-বলা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন; অন্যদিকে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস স্যার বিশ্বসাহিত্যের কিছু ধ্রুপদি কাজ বাংলায় অনুবাদ করেছেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের জন্য। আমাদের মনে হয়, অনুবাদ আপনাদের দাম্পত্য জীবনেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ—কী বলেন?
পারভীন ইলিয়াস : আমাদের গৃহকে এক অবিচ্ছিন্ন অনুবাদের ক্ষেত্রই বলতে পারো। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস এবং আমি দুজনই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী ছিলাম। নিজ ভাষার এবং বিদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যকর্ম পাঠের প্রতি আমাদের অনুরাগ বরাবরই ছিল। তবে অন্যান্য ভাষার সাহিত্যকর্ম আমরা কেবল ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই পড়তে পারতাম। এই অনুবাদগুলোই হয়ে উঠেছিল মূল রচনার সঙ্গে আমাদের সংযোগ স্থাপনের সেতু। অনুবাদের এই দর্পণেই আমরা চিনেছি দেশান্তরের সংস্কৃতি, তাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও লোকজ আচরণকে। এভাবে, অনুবাদের এই ভাবনাটি আমাদের চেতনায় এক প্রবল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং আমাদের এই পথে ব্রতী হতে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের অন্তরে এক যৌথ অভীপ্সা জেগে উঠেছিল যে পৃথিবীর মহান সাহিত্যকর্মগুলোকে বাংলাদেশি পাঠকদের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া আর বাংলা কথাসাহিত্যকে দূর-বিদেশের পাঠকদের দরবারে মেলে ধরা। যেমনটা বললাম, বাংলা সাহিত্যকে বিদেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেই তাগিদ থেকেই বাংলা কথাসাহিত্যকে ইংরেজিতে রূপান্তরের মাধ্যমে এই মহৎ প্রচেষ্টায় যৎসামান্য অবদান রাখার আমার এই প্রয়াস। তবে বলতেই হয়, আজকের এই খণ্ড-বিখণ্ড ও বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সাহিত্যকর্মের অনুবাদ কেবল শখ নয়, বরং এক অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা।
বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন আর আপনার পরবর্তী গ্রন্থটির ব্যাপারে যদি কিছু বলতেন।
পারভীন ইলিয়াস : আমার অনূদিত পরবর্তী গ্রন্থটিতে মূলত নারী লেখকদের সাহিত্যকর্মই বেশি থাকবে। এর পাশাপাশি, কোনো এক সময়ে সমকালীন নারী কথাসাহিত্যিকদের গল্প নিয়ে একটি স্বতন্ত্র সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনাও আমার রয়েছে। আর বর্তমানে আমি যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাদের নিয়ে লেখা একগুচ্ছ গল্প পড়ছি। দেখি সেখান থেকে কোনো গল্প অনুবাদের জন্য নেওয়া যায় কি না।