আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক ও আন্দোলনকর্মী। ১৯৫৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জীবনের চার দশকেরও বেশি সময় তিনি পার করেছেন শিক্ষকতা, লেখালেখি এবং দেশের সম্পদ ও মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ১৯৮২ সালে আনু মুহাম্মদ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। দীর্ঘ সময় তরুণদের অর্থনীতি পড়ানোর পাশাপাশি তিনি নৃবিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষকতা করেন। ২০২৩ সালে তিনি দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নেন। তবে কেবল চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষেই তার কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতি তৈরি করার পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল, যা পরে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক হিসেবে তার পথচলা শুরু হয় বেশ অল্প বয়সে। ১৯৭৩ সালে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে তার গণমাধ্যমে আসা। ধীরে ধীরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একজন মুক্তচিন্তক হিসেবে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। অর্থনীতি, দেশের বাজারব্যবস্থা, বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের ওপর উন্নয়নের নানা প্রভাব নিয়ে তিনি নিয়মিত বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখায় সবসময় মূল বিষয় ছিল কীভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, বরং তাদের সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। বর্তমানে তিনি উন্নয়ন ও সমাজভিত্তিক পত্রিকা ‘সর্বজনকথা’র সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।
লেখালেখির পাশাপাশি দেশের বড় বড় আন্দোলনে তিনি সরাসরি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আশি ও ৯০-এর দশকে বাংলাদেশ লেখক শিবির, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং গণআদালত গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকারের দাবিতেও তিনি ছিলেন সোচ্চার।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে আনু মুহাম্মদ সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে। ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনে তিনি সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন এক বিশাল প্রতিরোধ। সরকারের সঙ্গে চুক্তি সই করার সময়ও তিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে বেশ কয়েকবার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ২০০৯ সালে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হওয়া কিংবা ২০১১ সালে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো কিছুই তাকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময়ও তিনি শুরু থেকেই রাজপথে ছিলেন এবং ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
নিজের চিন্তাকে কাজের সঙ্গে মিলিয়ে চলার যে বিরল উদাহরণ আনু মুহাম্মদ তৈরি করেছেন, তা দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য এক বড় প্রেরণা।