সুমন-রিয়ার অন্যরকম গল্প

দর্শক ভালোবাসায় ‘ফ্যামিলি এক্সপ্রেস’

একান্নবর্তী পরিবারের সুবিধা অনেক। সেখানে একজন দায়িত্বশীল সদস্যের জীবনের ওপর দিয়ে যে কী পরিমাণের ঝড় বয়ে যায়, তা যেন অনেকেই এড়িয়ে চলেন। পরিচালক মহিদুল মহিম ‘ফ্যামিলি এক্সপ্রেস’ নাটকে সেই চেনা দৃশ্যপটকেই তুলে ধরেছেন হাস্যরসাত্মক, বাস্তবভিত্তিক এক পরিবেশনায়। চিত্রনাট্য, পরিচালনার অসাধারণ মুনশিয়ানায় পুরো গল্প জুড়ে পারিবারিক বন্ধন, প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে নিখুঁতভাবে।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দু সুমন। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে সে মামা-মামির যৌথ পরিবারে আশ্রিত হিসেবে বড় হয়েছে। মামা-মামির সহযোগিতায় পড়াশোনা শেষ করে সে এখন হন্যে হয়ে একটা ভালো চাকরির চেষ্টা করছে। যে পরিবার তাকে পরম স্নেহে বড় করেছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার দায়ে সংসারের সব কাজের ভার পড়ে সুমনের ওপর। বাজার-সদাই করা, বিল দেওয়া, ভাগ্নিকে কোচিংয়ে নেওয়া-আনা থেকে শুরু করে পরিবারের সব ফুটফরমাশ খাটার মূল কা-ারি সে নিজেই। নাটকের প্রধান মোড় আসে তখন, যখন পরিবারের ৯ জন সদস্যসহ এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে বাসে গল্পের নায়িকা রিয়ার সঙ্গে সুমনের হঠাৎ দেখা হয়। যৌথ পরিবারের সবার ব্যাগ-লাগেজ সামলানো, সবার দেখভাল করা, বাসের ভেতরে অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে রিয়া প্রথম দেখাতেই সুমনকে বাসের হেলপার, কন্ডাক্টর ভেবে ভুল করে বসে। সেখান থেকেই একের পর এক কৌতুকপূর্ণ, মজাদার ঘটনার জন্ম নিতে থাকে। পরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে। সুমনের সহজ-সরল ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে রিয়ার সঙ্গে তার পরিচয়, গভীর প্রেম গড়ে ওঠে।

গল্পের আসল মোড় ঘুরে যায় যখন দুই পরিবার একসঙ্গে বসে। চাকরি না থাকায় রিয়ার বাবা সুমনকে চাকরি খোঁজার জন্য মাত্র ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেন। এর মধ্যে চাকরি না পেলে অন্যত্র মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার স্পষ্ট শর্ত জুড়ে দেন। একদিকে চাকরির পরীক্ষার কঠিন প্রস্তুতি, অন্যদিকে পরিবারের অবিরাম কাজের চাপ দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সুমন রিয়াকে ঠিকমতো সময় দিতে পারে না। রিয়া খেয়াল করে সুমন সব সময় পরিবার নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ফলে তাদের প্রেমে ফাটল ধরে। অভিমানী রিয়া সুমনের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে ব্লক করে দেয়। ছয় মাস পর বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। নাটকের শেষভাগে এক চরম টানটান নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। সুমন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে নিয়ে রিয়ার বাসায় হাজির হয়ে দেখে বিয়ের আয়োজন চলছে। গল্পটি আর দশটা করুণ নাটকের মতো না হয়ে বেশ মিষ্টি, হাসিখুশি এক পরিণতি দিয়ে শেষ হয়।

চরিত্রায়ণের দিক থেকে সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট দায়িত্বশীল তরুণ সুমনের চরিত্রে অসাধারণ, প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন ইরফান সাজ্জাদ। পরিবারের প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসার টানে নিজের ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত প্রেম কীভাবে বিপন্ন হয়, সেই মানসিক অবস্থা, হতাশা তিনি নিজের চোখ, ভঙ্গিতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক, চঞ্চল, অভিমানী প্রেমিকা রিয়ার চরিত্রে সাদিয়া আয়মানের অভিনয় ছিল অত্যন্ত সাবলীল, দৃষ্টিনন্দন। বাসে হেলপার মনে করে সুমনকে টিপ্পনি কাটা থেকে শুরু করে সম্পর্কের টানাপড়েনের দৃশ্যগুলোতে তিনি দর্শক মনে দারুণ দোলা দিয়েছেন। একান্নবর্তী পরিবারের অভিভাবক হিসেবে নাদের চৌধুরী, শামীমা নাজনীন ছিলেন একদম বাস্তবসম্মত। ফারুক আহমেদ, দিপা খন্দকারের উপস্থিতি নাটকে কৌতুক, বিনোদনের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ, দারুণ কমেডি টাইমিংয়ের কারণে যৌথ পরিবারের হইচই, বাসের ভেতরের হাসির দৃশ্যগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ‘ফ্যামিলি এক্সপ্রেস’ কেবল একটি হাসির নাটক নয়। এটি যৌথ পরিবারের অদৃশ্য চাপ, পারিবারিক দায়বদ্ধতার মাঝে হারিয়ে যাওয়া এক তরুণের আত্মত্যাগের নিখাদ গল্প, যা সব বয়সী দর্শককে বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি গভীরভাবে ভাবায়।

তানভীর মাহমুদের প্রযোজনায় সুলতান এন্টারটেইনমেন্ট থেকে মুক্তি পাওয়া নাটকটি সপ্তাহ না পেরোতেই ইউটিউবে দেখেছেন ৬৫ লাখের বেশি দর্শক।