নতুন ক্যাপের সঙ্গে নতুন স্বপ্ন

আটজন অধিনায়কের শরীরেই সাদা জার্সি। তবে এক দেখায় আলাদা করা যায় তাদের গায়ে জড়ানো জার্সির কলারের নিচে ও বুকে দলের নাম লেখা রঙ দেখে। কোনোটা কালো, কোনোটা হলুদ, কোনোটা বেগুনি, আবার কোনোটা খয়েরি। ঠিক একই রঙের ক্যাপও উঠেছে তাদের মাথায়। গতকালই এ জার্সি আর ক্যাপ পেয়েছেন জাতীয় ক্রিকেট লিগের চার দিনের সংস্করণের অধিনায়করা। বেশ ঘটা করেই বিশেষ এই ক্যাপ তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছুটা খুনসুটিও করতে দেখা গেল রকিবুল-ইফতিদের মধ্যে। কার দলের ক্যাপের রঙ ভালো, সে নিয়েও তর্কে জড়ালেন তারা। নতুন এই ক্যাপের সঙ্গে আরও অনেক নতুনত্ব থাকছে এবারের এনসিএলে। এ টুর্নামেন্টে মাঠে নামার আগে নতুন স্বপ্ন দলগুলোর অধিনায়কদের চোখেও।

আটদলীয় এ টুর্নামেন্টের এবারের আসর শুরু হবে আগামী ৩ অক্টোবর। সেখানে নেতৃত্বে সবচেয়ে অভিজ্ঞ মোহাম্মদ মিঠুন। ৩৫ বছর বয়সী এ ব্যাটার খুলনা বিভাগীয় দলের অধিনায়কত্ব করবেন। গতকাল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনার এক ফাঁকে স্মৃতির ভেলায় চেপে ১৬ বছর আগে ফিরে গেলেন মিঠুন, ‘আমার শুরুটা আর এখনকার সময়টা এই দুটির সঙ্গে যদি আপনি তুলনা করতে যান, অবশ্যই কোনোভাবেই মিলবে না। কারণ আমার শুরুটা হয়েছিল, যতটুকু মনে পড়ে ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতা আর ১০টা ম্যাচ খেললে ২৫ হাজার টাকা পেতাম। এটাই ছিল আমার অভিষেকের সময়।’ পাশেই বসা এবারের এনসিএলের সবচেয়ে তরুণ অধিনায়ক ইফতি। এবার বরিশাল দলের দায়িত্ব সামলাবেন তিনি। মিঠুনের কথা শুনে জানান, তখন তার বয়স মাত্র ৪ বছর। এখন অবশ্য ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতার বিনিময়ে খেলতে হবে না ইফতিদের। বিসিবির নতুন উদ্যোগে প্রতি ম্যাচের জন্য দেড় লাখ টাকা করে পাবেন তারা। তার আগে অধিনায়কত্বের বিশেষ ক্যাপটাও মাথায় তুলেছেন তিনি। তবে এমন একটি দলের ভার তার কাঁধে, যেখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর অনেকবারই প্রকাশ্যে এসেছে। এবার এসব থেকে বের হওয়ার প্রতিশ্রুতি ইফতির কণ্ঠে, ‘আমি গত তিন-চার বছর ধরে এনসিএল খেলছি। আমি যতদিন ছিলাম, ওরকম গ্রুপিং হয়নি। জানি না কীভাবে এই কথা উঠছে। যদি গ্রুপিং হয়েও থাকে, আমি এবার থেকে চেষ্টা করব আর কখনো যেন এগুলো না হয়।’

ইফতির মতো প্রীতম কুমারও এবার পূর্ণ দায়িত্বে অধিনায়কত্ব পেয়েছেন। রাজশাহী বিভাগের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেট খেললেও কখনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামা হয়নি তার। এ জন্য ব্যাগি ক্যাপের ওজন কেমন হতে পারে সেটার কিছুটা আঁচ পাওয়া গেল প্রীতমের কথায়, ‘এই যে উদ্যোগটা নিয়েছে বিসিবি, সবার কাছেই অন্যরকম একটা অনুভূতি হবে। কারণ এটা ব্যাগি ক্যাপ, এটা সবাই সবসময় পায় না। বাংলাদেশে প্রথমবার এ রকম একটা জিনিস চালু হয়েছে। এটার জন্য অনেক ক্রিকেটার এখন মুখিয়ে থাকবে যে, আমার কখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হবে, জাতীয় দলের ক্ষেত্রে যেমন হয়।’

ব্যাগি ক্যাপ প্রাপ্তিকে টেস্ট সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সিলেটের অধিনায়ক জাকির হাসান, ‘টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য আসলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে উন্নতি আনার বিকল্প নেই। ব্যাগি ক্যাপের ব্যাপারটা তাই আমার কাছে মনে হয় খুবই ভালো উদ্যোগ। আশা করি ক্রিকেটাররা এখান থেকে আরও অনুপ্রাণিত হবেন।’

বোর্ডের এসব উদ্যোগের পর ক্রিকেটারদের দায়িত্বের পরিধিও যে এখন বেড়ে গেছে, সেই দিকটি তুলে ধরলেন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুর বিভাগের অধিনায়ক আকবর আলী, ‘অবশ্যই লক্ষ্য থাকবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। এবার যেহেতু নতুন একটা সংস্করণে খেলা হচ্ছে, সেকেন্ড ইলেভেন বা সেকেন্ড টায়ার থাকছে। আমি নিশ্চিত, প্রতিটা দলেই ওখান থেকে কিছু খেলোয়াড় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পাবে। আমার মনে হয়, এবার খেলোয়াড়দের পুলটা আরও বড় হচ্ছে। সব দলের জন্য এটা একটা সুযোগ যে, প্রত্যেকটা খেলোয়াড় বা প্রতিভাকে দেখার এবং তাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিয়ে আসার। আশা থাকবে ভালো খেলোয়াড়রা বাছাই হবে।’

আকবরের কথায় উঠে আসা ডিউক বলের প্রসঙ্গ। কারণ এবারের মৌসুমে বড় একটি পরিবর্তন এনেছে বিসিবি। সাম্প্রতিক কয়েকটি আসরে ব্যবহৃত ডিউক বলের বদলে জাতীয় লিগ ফিরছে চিরচেনা কোকাবুরা বলে। এই বল পরিবর্তন প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ঢাকার অধিনায়ক মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন, ‘যেকোনো ধরনের ক্রিকেটে খেলতে নামলে আমার কাছে কখনো অনেক সহজ মনে হয় না। কারণ আমি বিশ্বাস করি না যেকোনো নির্দিষ্ট বল কাউকে চিনে বানানো হয়েছে। এ জন্য সবসময়ই চ্যালেঞ্জ থাকে। এমনকি প্রত্যেকটা পেসার এখন অনুশীলনে ব্যস্ত যে ব্যাটারদের কীভাবে কোকাবুরা বল দিয়ে বোলিং করতে হবে। ওরা এটাও জানে যে, এই লেভেলে কোথায় কী করলে ভালো হয়। স্পিনারদের ক্ষেত্রেও আরও ভালো করার সুযোগ থাকবে।’

মূল একাদশের পাশাপাশি এবার এনসিএলে সেকেন্ড একাদশ নামেও ৮ দলের আরেকটি টুর্নামেন্ট হবে। এতে খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গটি সামনে আনেন চট্টগ্রামের অধিনায়ক ইয়াসির আলী রাব্বি, ‘আমার কাছে মনে হয়, মূল যে জিনিসটা আমাদের সাহায্য করবে, আগে যখন একটা খেলোয়াড়কে পরিবর্তন করতে হতো, তখন আসলে ওই খেলোয়াড়টা লাল বলে খুব একটা অভ্যস্ত থাকত না। কিন্তু এখন দেখেন, ৩০ থেকে ৪০ জন খেলোয়াড় দলের সঙ্গে থাকছে। দুটা দল মিলিয়ে হয়তো ৩০ জন খেলোয়াড় থাকবে। তো যাকেই আমরা হয়তো মাইনর থেকে আমাদের মূল দলে আনব, সে কিন্তু লাল বলে অভ্যস্ত থাকবে। এনসিএলের জায়গাটা তার জন্য হয়তো একদমই নতুন থাকবে না। তো আমার কাছে মনে হয়, মূল এ জিনিসটাই আমাদের জন্য একটা ইতিবাচক দিক, নতুন যে খেলোয়াড় আসবে, তার জন্য মানিয়ে নেওয়াটা সহজ হবে।’

উইকেটের চরিত্র নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ময়মনসিংহের অধিনায়ক রাকিবুল হাসান, ‘পিচ তো গত বছরও খুব ভালো ছিল। আমাদের কোনো কষ্ট করতে হয়নি উইকেটের জন্য। আমার মনে হয়, ব্যাটিং উইকেট একদিকে খারাপ না। কারণ ভালো উইকেটে বোলিং করলে বোলার হিসেবে অনেক কিছু শেখার থাকে। যে ভালো উইকেটে কীভাবে বোলিং করতে হয়, কোন লেন্থে বোলিং করতে হয়। তো আমার হিসেবে উইকেট ভালোই আছে।’