আ.লীগ-জামায়াত জোট!

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনী হয় গত জুলাইয়ে। প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি শোভা পায়, তাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি স্থান পায়নি। এ কারণে বেশ বিতর্কের মুখে পড়ে সংসদে বিরোধী দল জামায়াত।

ওই প্রদর্শনীর সুবাদে গুজব রটে যে, ফ্যাসিস্ট তকমা পাওয়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের তলেতলে আঁতাত হয়েছে। তারপরই ছয় দফা দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। দাবি পূরণ না হলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে নামার হুমকিও দেয় দলটি।

উপর্যুক্ত দুটি ঘটনায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন দহরম-মহরমের (অ্যালায়েন্স) রসালাপ রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক মহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের যোগসূত্রের খোঁজ শুরু হয়ে যায়। সরকারি দল বিএনপিতেও বিরোধী দল জামায়াতকে নিয়ে সংশয়-সন্দেহের সৃষ্টি হয়। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কানেকশন নিয়ে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তৎপর হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ বাদে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোও গন্ধ শুকতে থাকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্কের (অ্যালায়েন্স) বিষয়ের। বিএনপির একটি অংশ এ নিয়ে সমালোচনা করে বলেছে আওয়ামী লীগ তোষণের রাজনীতি শুরু করেছে জামায়াত; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা। ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতিতে ঠিক এ অভিযোগই জামায়াত করেছিল বিএনপির বিরুদ্ধে এবং তা একাধিকবার করেছে। বিএনপি যদিও সে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এখন একই অভিযোগ জামায়াতের বিরুদ্ধে এনেছে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতের কর্মসূচি স্পষ্ট, পরিচ্ছন্ন। বিএনপির সরকার গঠনের সময় দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারা নিয়েছে একটি। গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার টালবাহানা করছে। আমরা সুনির্দিষ্ট ইস্যূতে আন্দোলনে নেমেছি।’

তিনি বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের অ্যালায়েন্সের বিষয়ে কথা বলছেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা সুস্থ নয়। জামায়াতের কর্মসূচি নিয়ে যারা কোনো ধারণা রাখেন না, তারাই কেবল বাস্তবতাবর্জিত কথা বলতে পারেন।’ 

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের ‘অ্যালায়েন্সের খবর’কে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে। তারা বলেন, ‘তেল কখনো জলে মিশে না। কিন্তু তেল ও জল মিলিয়ে এক ধরনের প্রচারণা (প্রোপাগাণ্ডা) গুজবের বাজারে ছাড়া হচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি শ্রেফ গুজব।’

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা বলেন, ‘এ গুজব জামায়াতের পক্ষ থেকে ছড়ানো হচ্ছে। তারা গুজব ছড়ানোতে পারদর্শী। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে নানামুখী চাপে রাখতে জামায়াত এ কৌশল নিয়েছে।’ 

জানা গেছে, বিএনপি যাতে অতিমাত্রায় জামায়াতের কব্জায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে কৌশলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্টতার গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে তারা নিজেরাই। গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ডিসেম্বরকে ঘিরে জামায়াত হুমকি-ধামকিতে রেখেছে বিএনপিকে। ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতও ডিসেম্বরকে ঘিরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের আওয়াজ তুলেছে। ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে জামায়াত একটি যোগসূত্র স্থাপন করার চেষ্টা করেছে। তাই জামায়াতও ডিসেম্বরবিষয়ক হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে।

আরও জানা গেছে, বিএনপির ভেতরে জামায়াতকে নিয়ে আগে থেকেই একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। জামায়াতকে খানিকটা অবিশ্বাসের চোখে দেখে বিএনপি। বিদ্যমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অপরাপর রাজনৈতিক শক্তির আড়ালে থেকে কখন জনঅসন্তোষ উসকে দেওয়া হবে, সে দুশ্চিন্তা বিএনপির ভেতরে আছে। তারা মনে করে, বিএনপির এ দুশ্চিন্তাকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অ্যালায়েন্সের গুজব বাজারে ছেড়েছে জামায়াতই। রাজনৈতিক কৌশল থেকে ডিসেম্বর ঘিরে বিএনপিকে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করেছে জামায়াত। আসলে ডিসেম্বর ঘিরে জামায়াতের কোনো পরিকল্পনা নেই।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের অ্যালায়েন্সের খবর দলটির নেতারাই ছড়াচ্ছে, যার কোনো ভিত্তি নেই। আওয়ামী লীগ সবসময় জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিকে নিজেদের কব্জায় রাখার রাজনীতি করছে জামায়াত। বিএনপিকে চাপে রাখতে চায় দলটি। তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে অ্যালায়েন্সের খবর তাদের দিক থেকে মাঠে ছাড়া হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর জামায়াতের একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘেঁষার রাজনীতি করেছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ সে সুযোগ দেয়নি জামায়াতকে। বছরের পর বছর কেটে গেলেও জামায়াতকে রাজনৈতিক সুবিধা দেবে না আওয়ামী লীগ। ভেতরের বাস্তবতা এমন হলেও বাইরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের অ্যালায়েন্স হওয়ার গুজব বাজারে চাওর রাখার রাজনীতি ইচ্ছে করেই করছে জামায়াত। বিএনপিকে কাবু করতে এ গুজব ভীষণ কাজে আসবে জামায়াতের।’ 

অপর একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কায়দায় যোগাযোগ স্থাপন করে জামায়াতের একটি অংশ। আওয়ামী লীগের ভোটের আশায় এ যোগাযোগ শুরু করে তারা। কায়দাটি আবার অনুসরণ করা হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত তার প্রার্থীদের ভোটে সুবিধা পাইয়ে দিতে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে।