সৌদি বিমানঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় হুতিদের হামলা

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে। এতে সামরিক-বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি তেল সরবারহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা গতকাল বুধবার সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের তেল স্থাপনায় ও খামিশ মুসায়িত বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের মারিব এলাকায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরব বলছে, পবিত্র নগরী মক্কার আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই এর দক্ষিণে হুতিদের একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে রিয়াদের ড্রোন হামলার দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে হুতিরা। এদিকে, হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেশটির সরকারি বাহিনীর লড়াই তীব্রতর হচ্ছে। লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠছে মারিব ও তাইজ অঞ্চল।

গতকাল বুধবার হুতিদের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকো লক্ষ্য করে এক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। দ্বিতীয় হামলাটি হয়েছে খামিশ মুসায়িত বিমানঘাঁটিতে। হুতিরা বলছে, সুনির্দিষ্ট এই হামলায় তেল স্থাপনাটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ হামলার বিষয়ে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দেশটির দাবি, পবিত্র মক্কা নগরীতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুতিরা। ইয়েমেনের সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি এক বিবৃতিতে জানান, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি শনাক্ত এবং ভূপাতিত করেছে। তিনি জানান, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর মক্কাকে লক্ষ্য করে এটি হুতিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হিজাম আল-আসাদ রিয়াদের এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করে বলেছেন, হুতিদের একটি ড্রোন মক্কাকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছিল এমন দাবি একটি নির্জলা মিথ্যা। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আল-আসাদ বলেন, পবিত্র মক্কাকে লক্ষ্য করার দাবি একটি জঘন্য মিথ্যা। এই মিথ্যা আগেও বলা হয়েছে, তবে এখন আর কাউকে বোকা বানাতে পারছে না সৌদি আরব। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গতকাল বুধবার দাবি করেন, মারিব এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। তিনি জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি স্থানীয়ভাবে নির্মিত। বিবৃতিতে হুতিদের মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের মুখে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী (হুতি বিদ্রোহীরা) সৃষ্টিকর্তার সহায়তা ও অনুগ্রহে সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।’ যুদ্ধবিমানটি ইয়েমেনের মারিবের আকাশসীমায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর তৎপরতায় সহায়তা করার সময় ভূপাতিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ইয়াহিয়া সারি। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, মারিবের উত্তর-পশ্চিমে মাউন্ট হেলানের কাছে হুতিরা যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে।

এদিকে, ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। তাইজ থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থানগুলোতে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে দেশটির সরকারি বাহিনী। ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তাইজ প্রদেশের দু বাব এবং পার্শ্ববর্তী হোদাইদা প্রদেশের খোখা এলাকায় হুতিদের জনবল, সামরিক সরঞ্জাম ও লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলা চালানো হয়। এই এলাকাগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলসংলগ্ন লোহিত সাগর এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির খুব কাছে অবস্থিত।

রণকৌশলগতভাবে দু বাব অঞ্চলটি সরাসরি বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে এবং খোখা অঞ্চলটি লোহিত সাগর উপকূলের আরও উত্তরে অবস্থিত। তাইজের চারপাশের যুদ্ধক্ষেত্রকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের সঙ্গে সংযোগকারী ফ্রন্টলাইনজুড়েই বর্তমানে এই লড়াই চলছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নাজিলি জানান, দুটি এলাকাতেই হুতিদের সামরিক সরঞ্জাম, সেনা সদস্য এবং মূল ঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে সরকারি বাহিনী। হুতি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াইয়ের আরেকটি মূল কেন্দ্র হয়ে উঠছে মারিব অঞ্চল। এটি ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি। একই সঙ্গে এটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসকেন্দ্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, হুতিরা যদি মারিব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে লড়াইয়ের গতিপথ চূড়ান্তভাবে তাদের পক্ষে ঘুরে যেতে পারে। ঘুরে যেতে পারে ইরান যুদ্ধের মোড়ও।