সোনালী ব্যাংকের বোনাসের ১১৬ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশ

নীতিমালা ভেঙে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নির্দেশ দেওয়ার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই টাকা আদায় হয়নি; বরং পরিশোধ করা বোনাস অনুমোদন করার জন্য সরকারের কাছে ফের অনুরোধ জানিয়েছে সোনালী ব্যাংক।

সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে চিঠি দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। চিঠিতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন-প্রতিবেদনেও সোনালী ব্যাংকের পাঁচটি বোনাস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পরিদর্শন-প্রতিবেদন তৈরির পর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সোনালী ব্যাংক ২০২৩ সালের জন্য পাঁচ উৎসাহ বোনাস বাবদ ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ২০২৪ সালের জন্যও ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান করা হয়েছিল।

শুধু সোনালী ব্যাংক নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢালাওভাবে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য এ নির্দেশিকা। তাতে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সূচকে ব্যাংকের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের দুই দিন পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করেন ব্যাংকটির একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অন্যতম দাবি ছিল বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে। এর আগে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যদিও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকলে এক পর্যায়ে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এর আগে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। বিষয়টি নিয়ে পরে নিরীক্ষা-আপত্তি ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।

এরপর প্রায় দুই বছর পার হলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনিও বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু দেড় বছরেও তা কার্যকরী হয়নি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালের নীতিমালা এবং ২০২৫ সালের নীতিমালা, কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অথচ ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য তারা পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নিয়েছেন।

সোনালী ব্যাংকসূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিতে বোনাস নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৫০০। নিয়মিত তিনটির সঙ্গে তারা বাড়তি দুটি বোনাসও নিয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের অর্থ এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকটির একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, একটি বোনাসেই মোট প্রায় ৬০ কোটি টাকা দিতে হয়। সে হিসাবে দুই বোনাসের জন্য প্রায় ১১৬ কোটি টাকা লেগেছে।

সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও সিইও শওকত আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাঁচ বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘যেকোনোভাবেই হোক, টাকা যেহেতু পরিশোধ করা হয়ে গেছে সেহেতু আমরা সরকারকে তা মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। নতুন করে আবার একই অনুরোধ জানাব।’

বোনাস ফেরত নেওয়া হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘দেশের দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ভালো পারফরম্যান্স করেছে। কর্মীদের উৎসাহিত রাখার বিষয়টিও ব্যাংক-কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হবে।’