চট্টগ্রামের চায়ে বইছে সুবাতাস

সুবাতাস বইছে চট্টগ্রামের চা-শিল্পে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি নিলাম বাজারেও বিরাজ করছে ইতিবাচক ধারা। চলতি বছর প্রথম আট মাসে চট্টগ্রামের চা বাগানগুলোতে বিগত বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক নিলাম বাজারে চলতি নিলামবর্ষের মোট ১৭টি নিলামে গড়ে প্রতি কেজি চা ২৮০.৮৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাগান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এ বছর চায়ের উৎপাদনে নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে।

চা বাগান মালিক ও উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২২টি চা বাগানে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ৬১ লাখ ৫৫ হাজার ৮১ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় যা ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে একই বাগানগুলোর মোট উৎপাদন ছিল ৫২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮১ কেজি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা বাগানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ১০টি বাগানেই উৎপাদিত হয়েছে ৫০ লাখ কেজির বেশি চা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৫১২ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে কর্ণফুলী চা বাগানে। সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন ৬ হাজার ৫৭২ একর আয়তনের এই বাগানটিকে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চা বাগান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শতভাগ ক্লোন চা বাগান হালদা ভ্যালী টি এস্টেট। সেখানে আট মাসে ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৪০১ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। পেডরোলো এনকে লিমিটেডের উদ্যোক্তা নাদের খানের মালিকানাধীন এই বাগানে রয়েছে ভূগর্ভস্থ স্থায়ী সেচব্যবস্থা। তৃতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদিত হয়েছে নেপচুন চা বাগানে। দেশের খ্যাতনামা করপোরেট গ্রুপ এম এম ইস্পাহানী লিমিটেডের মালিকানাধীন এই বাগানে আগস্ট পর্যন্ত মোট উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ৬ লাখ ৫ হাজার ১৮০ কেজি। এ ছাড়া উদালিয়া চা বাগানে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ১০৮ কেজি, বারমাসিয়া চা বাগানে ৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৯ কেজি, খৈয়াছড়া ডলু চা বাগানে ৪ লাখ ১৬৮ কেজি, রাঙ্গাপানি চা বাগানে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩৬২ কেজি, রামগড় চা বাগানে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৫২ কেজি, কোদালা চা বাগানে ৩ লাখ ৯ হাজার ৬২১ কেজি ও চানপুর বেলগাঁও চা বাগানে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৪৫ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে।

বাগান-সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর উৎপাদন মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ভালো থাকায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালীসহ এ অঞ্চলের চা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে। সাধারণত বছরে ৬০ থেকে ১০০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। আবার টানা তিন মাস অনাবৃষ্টি বা খরা থাকলে চায়ের নতুন কুঁড়ি জন্মানো বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশীয় চা সংসদের হিসাবে এই আট মাসে চা বাগানগুলোতে মোট ৬৮ দশমিক ৪৮ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আবার টানা দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির মতো অবস্থাও ছিল না। যার ফলে এবারের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চায়ের ভালো দর উঠছে নিলাম বাজারেও। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্রে সপ্তাহের নিয়মিত চা নিলামেও বেড়েছে ভালো মানের চায়ের কদর। ইস্পাহানী, টিকে গ্রুপ, সিটি গ্রুপসহ দেশের খ্যাতনামা কোম্পানি ও পাইকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিলামে অংশ নিয়ে থাকে। চা বোর্ড সূত্র জানায়, চলতি নিলামবর্ষে আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিলাম বাজারে মোট ১৭টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নিলামে মোট ৩ কোটি ৭৬ লাখ ১ হাজার ১৯০ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এ সময় চায়ের গড় মূল্য উঠেছে প্রতি কেজি ২৮০ দশমিক ৮৮ টাকা।

বাংলাদেশীয় চা সংসদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও চানপুর বেলগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার বাগানগুলোতে চায়ের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তিনি বলেন, টি এস্টেটগুলো এখন মানসম্পন্ন চা উৎপাদন করছে। বাজারে ভালো মানের চায়ের কদর থাকায় এবং নিলাম বাজারে ন্যায্য দর পাওয়ার কারণে বাগান মালিকদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে বর্তমানে মোট ২২টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি রয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলায়। এ ছাড়া রাঙ্গুনিয়ায় ৩টি, বাঁশখালীতে ১টি ও কাপ্তাইয়ে ১টি বাগান রয়েছে।