মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ নতুন করে ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ায় সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বুধবার সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। পাল্টা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে হুথিরা। খবর রয়টার্স।
সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জোরদার করেছে। দেশটির সরকারি কর্মীদের ইয়েমেন সীমান্তের ২০ মাইলের মধ্যে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
হুথিরা দাবি করেছে, গত সপ্তাহ থেকে তারা লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ইয়েমেনের একাধিক শহরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখলে নিয়েছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির মুখে অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় তেলবন্দর ইয়ানবু এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এসব হামলা ঠিক কখন হয়েছে, তা তিনি জানাননি।
মঙ্গলবার সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করেছিল। তবে বুধবার একই ধরনের সতর্কতার খবর পাওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এর আগে ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, হুথিরা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তবে ওই দাবির পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হুথি মুখপাত্রের দাবি, চলতি সপ্তাহে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে প্রায় ৪৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, তাদের বাহিনী ও সৌদি আরব হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। তবে রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।
মক্কা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
গত সপ্তাহজুড়ে হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বারবার হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার সৌদি আরব দাবি করে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয় বলে জানায় রিয়াদ।
সৌদি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার জন্য ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে হুথির মুখপাত্র মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রচারণার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছে।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন শঙ্কা
ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৮ ডলারে অবস্থান করছিল, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্যও নতুন রেকর্ড গড়ে প্রতি গ্যালন ৬.৩০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সৌদি আরব কবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময় জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট মঙ্গলবার সিএনবিসিকে বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ওই পাইপলাইন দিয়ে আবারও অপরিশোধিত তেল পরিবহন শুরু হতে পারে।
ওমানে যুক্তরাষ্ট্র-হুথি বৈঠক
জানা গেছে, গত সপ্তাহান্তে ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথিদের একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে হুথিরা জানিয়েছে, মার্কিন জাহাজে হামলার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই এবং গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রতি তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
চলতি মাসে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের অগ্রযাত্রার পর সহিংসতা আরও তীব্র হয়েছে।
এরই মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যেই সীমিত রয়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস ধরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ওই অভিযান বন্ধ হয়। সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তির আওতায় জাহাজে হুথিদের হামলা বন্ধ হওয়ার কথা।
বর্তমানে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছে। হুথিদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিলে ইয়েমেন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।