মিলছে না গ্যাস সংযোগ ক্ষতির মুখে উদ্যোক্তারা

পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) গাফিলতিতে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে এখনও মেলেনি গ্যাস সংযোগ। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এখানকার শিল্প উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, গ্যাস-সংযোগের অনিশ্চয়তায় অনেক উদ্যোক্তাই বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তার ওপর দেশে চলমান গ্যাস সংকট তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো শিল্পপার্কে দ্রুত গ্যাস-সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

উত্তর বঙ্গের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের এ শিল্পপার্কটি। এটি গড়ে তোলার পরপরই পিজিসিএল গ্যাস-সংযোগের অবকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ সংযোগ পাইপলাইন নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেয়। সে অনুযায়ী ২০২২ সালের ২০ জুন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পপ্লটগুলোয় গ্যাস-সংযোগ দিতে পিজিসিএলের অনুকূলে ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জমা দেয়। কিন্তু পিজিসিএল শিল্পপার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইন স্থাপন করার পর কাজ বন্ধ করে দেয়। তারপর আর শিল্পপার্কের ভেতর অংশে গ্যাস সরবরাহের অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু করেনি। ফলে ৪ বছর ধরে নানা জটিলতায় ঝুলে আছে প্রকল্পটি। এতে উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে তারা অভিযোগ করেছেন। সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে একটি মেমো ইস্যু করে।

সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ ব্যবস্থা নিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এরপর ২০ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখাও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য তাগিদপত্র দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণময় বর্দ্ধন বলেন, পিজিসিএল কর্তৃপক্ষ শিল্পপার্কটির অভ্যন্তরীণ গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ না করায় উদ্যোক্তারা বিসিককে চাপ দিচ্ছে। বিষয়টি একাধিকবার পিজিসিএলকে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। তারপরেও কাজ হচ্ছে না।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজা নিয়ে প্রায় ৪০০ একর জমিতে সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্কটি হয়েছে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে এর কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুন মাসে। কাজ শেষ না হওয়ায় সাত দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে এখনও অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। যমুনা পেপার অ্যান্ড বোর্ড ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি এ শিল্পপার্কে চারটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। প্লটগুলো এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এর পরে গ্যাসলাইনও স্থাপন করা হচ্ছে না। এখন কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না।

জিলানি অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের জানান, তিনি ছয়টি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। কিন্তু সব প্লটেই মাটি ভরাটের কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে তিনি নিজ খরচে মাটি ভরাট করেছেন। বর্তমানে মেশিনপত্র স্থাপনের কাজ চলছে। গ্যাস পেলে দ্রুত কারখানা চালু করার আশা করছেন তিনি।’

যমুনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ইকবাল হাসান জানান, তিনি সমবায় সমিতির মাধ্যমে দুইটি প্লট বরাদ্দের টাকা দিয়েছেন। এখন শুনছেন, গ্যাস নেই। গ্যাস পাইপলাইন না থাকলে ব্যাংকও বিনিয়োগ করবে না।

উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, গ্যাস-সংযোগ বিবেচনায় রেখেই তিনি প্লট নিয়েছেন। কিন্তু এখনো গ্যাস পাইপলাইন স্থাপিত না হওয়ায় তিনি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন।

বিসিক কার্যালয়ের তথ্যমতে, প্রকল্পে ২৭৫ একর জমিতে এ, বি ও সি এই তিন ক্যাটাগরিতে ৮২৯টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি প্লট বিদেশি এবং ২৭৯টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে। এ ক্যাটাগরির প্লট ২০ হাজার বর্গফুট, বি ক্যাটাগরির প্লট ১০ হাজার বর্গফুট এবং সি ক্যাটাগরির প্লট ৬ থেকে ২৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দুই ধাপে ২৭২টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, শিল্পপার্কের প্রধান ফটকের পাশে এসেই গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ থেমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো শিল্পপার্কে দ্রুত গ্যাস-সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের শিল্প উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, ‘জ্বালানি ও গ্যাসের ব্যবস্থা না থাকলে এখানে কেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন? ব্যাংকও ঋণ দেবে না। দ্রুত গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনসহ সব ধরনের সেবা নিশ্চিত না হলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের কিস্তির টাকা কেউ জমা দেবেন না বলে উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণময় বলেন, ‘জ্বালানি ও গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি এখন পুরোপুরি পিজিসিএলের ওপর নির্ভরশীল।’

এ বিষয়ে পিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এসএম তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অতিবৃষ্টির কারণে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ থাকলে সংযোগ দেওয়া হবে।’