ব্রিকস: যেখানে খালি চেয়ার কথা বলে...

কূটনীতি যখন মিথ্যা বলতে চায়, সে বিবৃতি দেয়। আর যখন সত্যি বলতে চায়, সে চুপ করে থাকে। দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে চীন কোনো বিবৃতি দেয়নি। সে শুধু একটি হাত ছেড়ে দিয়েছে, একটি চেয়ার খালি রেখেছে। আর তাতেই বলা হয়ে গেছে যা কোনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দশটা প্রেস নোটে বলতে পারত না— বেইজিং দিল্লিকে সমকক্ষ মনে করে না। বন্ধু তো নয়ই।

ফটো তুলবার সময়ে মোদি হাত বাড়িয়েছিলেন। পুতিন সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন— শরীর, চোখ, হাসি, সব মিলিয়ে একটা "হ্যাঁ"। শি জিনপিং হাতটা ধরলেন, কিন্তু এক চুলও এগোলেন না। একটাই ছবিতে ধরা পড়ল দুই ধরনের মিত্রতা— একটা আন্তরিক, আরেকটা সতর্কতা। এবং ভারত সেই দ্বিতীয়টাকেই প্রথমটার মতো দেখানোর চেষ্টা করে গেল সারাদিন।

মঞ্চ ভারতের, বার্তা চীনের

আয়োজক ভারত। ক্যামেরা ভারতের। তবু বিবৃতিটা এল বেইজিং থেকে— শরীরী ভাষায়, নীরবতায়, একেবারে বিনা খরচে। এটাই আসল লজ্জা। যে দেশ নিজের মাটিতে, নিজের আয়োজনে, নিজের ক্যামেরার সামনে বসেও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে উষ্ণতা ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়— সে দেশ যতই "বিশ্বগুরু" শব্দটা উচ্চারণ করুক, তার আঞ্চলিক শক্তির দাবিটাও প্রমাণসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

শি জিনপিং জানেন, একটা ছবি একদিন বাঁচে, কিন্তু ক্ষমতার হিসাব বাঁচে দশকের পর দশক। তাই তিনি ক্যামেরার জন্য ঠিক ততটুকুই দিলেন যতটুকু না দিলে অভদ্রতা হয়ে যেত— এক পয়সা বেশি নয়। ভারত চেয়েছিল একটা উষ্ণ পারিবারিক ছবি; পেল একটা কূটনৈতিক রসিদ, যেখানে লেখা: "প্রাপ্ত, কিন্তু গৃহীত নয়।"

গালা ডিনার: খালি চেয়ারের কথকতা

তারপর সন্ধ্যা এল, আর তার সঙ্গে দ্বিতীয় ধাক্কা। মোদির গালা ডিনারে শি এলেন না। ওয়াং ই এলেন তার জায়গায়— একান্তই সৌজন্যতার প্রতিনিধি কিন্তু ক্ষমতার নয়। ব্যাখ্যা: রাষ্ট্রপতি ক্লান্ত, হোটেলে বিশ্রামে।

এই "ক্লান্তি" রাষ্ট্রীয় কূটনীতির সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে অপমানজনক ভদ্র মিথ্যা। কারণ কেউ বিশ্বাস করে না, এবং বিশ্বাস করানোরও উদ্দেশ্য নেই। উদ্দেশ্যটা উল্টো— বার্তাটা যেন বোঝা যায়, অথচ অস্বীকার করারও জায়গা থাকে। চীন এখানে স্পষ্ট করে দিল: ভারতের আতিথ্য প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে না, কিন্তু তা গ্রহণ করাটা কোনো বাধ্যবাধকতাও নয়। অতিথিকে দরজায় ঢুকতে দেওয়া হয়েছে; হেড টেবিলে বসার আসনটা দেওয়া হয়নি।

দিল্লি চেয়েছিল একটা ছবি— ঐক্যবদ্ধ, উষ্ণ ব্রিকস, যার কেন্দ্রে ভারত। শি সেই ফ্রেম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন, এবং সেই সরে যাওয়াটাই হয়ে দাঁড়াল দিনের সবচেয়ে জোরালো বিবৃতি।

বিরল মৃত্তিকা আর ভারতের অনুযোগ

শি'র সামনে দাঁড়িয়ে মোদি বললেন, প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে "অস্ত্র" বানানো উচিত নয়। নাম নেননি। নেওয়ার দরকারও ছিল না— বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে একচেটিয়া প্রভাব যার হাতে, তাকে চেনাতে কারও অসুবিধা হয় না।

কিন্তু এখানেই ভারতের অবস্থানের দুর্বলতাটা প্রকাশ পেয়ে যায়। কূটনৈতিক ভাষায় মোড়ানো এই "আবেদন" আসলে একটা স্বীকারোক্তি— ভারত এখনও এমন এক সরবরাহ-শৃঙ্খলার করুণাপ্রার্থী, যার চাবি প্রতিপক্ষের হাতে। যে দেশ মঞ্চে সমকক্ষতার ভান করে, অথচ ঠিক পরের বাক্যেই নির্ভরতার কথা বলে ফেলে— তার সমকক্ষতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা অবান্তর নয়।

বিআরআই: প্রতিবেশীর উঠানে চীনের ইট

শি যখন সংযোগ আর উন্নয়ন-সহযোগিতার কথা বলেন, তিনি আসলে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র নতুন করে আঁকার কথা বলছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, পাকিস্তান— ভারতের নিজের উঠান বলে দাবি করা তিনটি দেশেই চীনা বন্দর, সড়ক, রেল আর জ্বালানি-সংযোগ একটু একটু করে গেঁথে বসছে। দিল্লি এই তিন দেশকে "স্বাভাবিক প্রভাবক্ষেত্র" ভাবতে অভ্যস্ত; বেইজিং সেই অভ্যাসটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, ইট দিয়ে, ঋণ দিয়ে, বন্দর দিয়ে— বিবৃতি দিয়ে নয়।

এটা উন্নয়ন-প্রকল্প নয়। এটা এক নীরব সীমানা-পুনর্বিন্যাস।

কেউ বলবেন, একটা হাত না ধরে টানা, একটা ডিনারে অনুপস্থিতি— এসব নিছক দেহভঙ্গি, অতি-ব্যাখ্যা। কিন্তু ইতিহাস সবসময় বিবৃতি দিয়ে লেখা হয় না। কখনও কখনও শুধু কেউ একজন আপনার বাড়ানো হাতের টানে এগিয়ে আসে না— আর সেটাই যথেষ্ট বলে দিতে, সম্পর্কটা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে।

ভারত-চীন সম্পর্ক আজ এক অস্বস্তিকর সমীকরণ— করমর্দন আছে, বিশ্বাস নেই; বৈঠক আছে, স্বস্তি নেই; আতিথ্য আছে, তা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা— ভারত যে নেতৃত্বের ছবি বিশ্বকে দেখাতে চায়, চীন প্রকাশ্যে তা অস্বীকার না করেই, প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে ছোট করে দিচ্ছে। প্রত্যাখ্যাত হাতটা তাই শুধু একটা দেহভঙ্গি নয়— এটা একটা রায়, যা দিল্লিকে শুনতেই হবে, না চাইলেও...

*অজেয় রোহিতাশ্ব আল্ কাযী
প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক