পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখর তাড়াশের উলুপুর দিঘি

মাথার ওপর আকাশজুড়ে ডানা মেলা শত শত পাখির ঝাঁক। পর মুহূর্তেই তারা নেমে আসছে দিঘির জলে। কেউ ডুব দিয়ে খাবার খুঁজছে, কেউ-বা জলের ওপর ভেসে ভেসে জলকেলিতে মত্ত। কেউ বসে আছে গাছের ডালে, কেউ আবার ডানা ছড়িয়ে রোদ পোহাচ্ছে। হঠাৎ আবার ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। শত শত পাখির ডানার ঝাপটায় বাতাসে কাঁপছে তরুলতাও। পাখিদের কলকাকলিতে ভোরের নীরবতা ভেঙে জেগে উঠছে গ্রামপ্রান্তর। নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো পাখিদের ছায়া পড়ছে দিঘির জলে। তৈরি হচ্ছে এক অপূর্ব দৃশ্য, যা উপস্থিত দর্শনার্থীদের অভিভূত করছে। সে মনোরম দৃশ্যে আটকে যাচ্ছে তাঁদের চোখ। এ সময় কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন প্রকৃতির এই অবিশ্বাস্য আয়োজনের দিকে। মনে হচ্ছে, শীতের আগমনী নরম রোদে তাড়াশের মাটিতে যেন নেমে এসেছে এক টুকরো আকাশ—আর সে আকাশজুড়ে উড়ছে হাজারো অতিথি।

এ অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য এখন বিরাজ করছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পৌর শহরের উলুপুর দিঘি এলাকায়। শীতের আগমনী অতিথি পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনায় দিঘিটি পরিণত হয়েছে প্রাণের এক অনন্য মিলনমেলায়। ভোর হতেই এখানে শুরু হয় পাখিদের ব্যস্ততা, আর তা দেখতে দিঘিপাড়ে জমে ওঠে অসংখ্য পাখিপ্রেমী মানুষের ভিড়। ভোরের আলো ফুটতেই বদলে যায় উলুপুর দিঘির পরিবেশ। অন্য সময় যে দিঘি শান্ত ও নিরিবিলি থাকে, পাখিদের উপস্থিতিতে সেটিই যেন হয়ে উঠেছে প্রকৃতির এক জীবন্ত মঞ্চ। নীল জলে ভেসে থাকা পাখির দল, গাছের ডালে সারি সারি পাখি আর আকাশে উড়ে চলা পাখির ঝাঁক—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য আবহ। কখনো হঠাৎ শত শত পাখি একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশে উঠে যায়, কয়েক মুহূর্ত পর আবার ফিরে আসে দিঘির জলে। তাদের ডানার শব্দ, কিচিরমিচির আর কলকাকলিতে চারপাশ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী রাজ শেখ, সোহাগ হাসান ও নাইম বলেন, উলুপুর দিঘির চারপাশের গাছপালা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর শীত এলেই এখানে পাখির সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। পরিবেশটি রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি পাখির সমাগম ঘটতে পারে। তাদের মতে, দিঘির পাড়ে মানুষের উপস্থিতি এখন পাখি দেখার একটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। তবে দর্শনার্থীদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে তাঁদের কারণে পাখির স্বাভাবিক বিচরণে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।

প্রকৃতির টানে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উলুপুর দিঘির পাড়ে ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ একা।

বারুহাস ইউনিয়ন থেকে পরিবার নিয়ে পাখি দেখতে আসা সাগর তালুকদার বলেন, পাখিদের বিচরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সারাক্ষণ কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ মুখরিত থাকে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে খুব ভালো লাগছে। সুযোগ পেলে আবারও বন্ধুবান্ধব নিয়ে এখানে আসবেন বলে জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা শাপলা খাতুন, নার্গিস বেগম ও সামিউল হাসান জানান, দিঘির জলে একসঙ্গে এত পাখির বিচরণ দেখতে তাদের খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে পাখিদের দলবদ্ধভাবে উড়ে যাওয়া এবং আবার একসঙ্গে পানিতে নেমে আসার দৃশ্য তাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।

দর্শনার্থীদের অনেকেই মনে করেন, উলুপুর দিঘিকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি স্থানীয়ভাবে পাখি দেখার একটি চমৎকার পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চলতি শীত মৌসুমে শুধু উলুপুর দিঘিই নয়, তাড়াশের বিস্তীর্ণ চলনবিলেও দেখা মিলছে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক। বিলে জলাভূমি, দিঘি ও আশপাশের চরাঞ্চল হয়ে উঠেছে নানা প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র।

জলময়ূর, মদনটাক, মানিকজোড়, লালমোরগ, শামুকখোল, বক, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনায় এ সময় প্রাণ ফিরে পায় জলাভূমিগুলো।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জলজ খাবারের সহজলভ্যতা এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে এই শীত মৌসুমে এসব এলাকায় পাখির আনাগোনা বাড়ে।

যমুনা সেতু পশ্চিম ইকোপার্কের ফরেস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, শীতের প্রকোপ কমে গেলে অতিথি পাখিরা আবার নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যায়। আপন ভূমিতে ফেরার জন্য তাদের আবারও হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। তিনি জানান, যে নিরাপত্তার জন্য অতিথি পাখি এ দেশে আসে, অনেক সময় তারা সেই নিরাপত্তা পায় না। কিছু অসাধু মানুষ বিভিন্ন সময় পাখি শিকার ও হত্যা করে। এভাবে পাখি নিধন চলতে থাকলে প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারাবে এবং বিলুপ্ত হতে পারে বহু প্রজাতির পাখি। তিনি অতিথি পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতন ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান।

পরিবেশবাদী সংগঠন 'স্বাধীন জীবন'-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক নাছিম বলেন, পাখি প্রকৃতির অলংকার। পরিযায়ী পাখি হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে, যা দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্ত বলেন, অতিথি পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ফসলের ক্ষতিকর পোকা খাওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহার কমতে পারে, এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচও কমে। পাশাপাশি পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক সারের কাজ করে।

উলুপুর দিঘির মানুষের প্রত্যাশা একটাই—প্রতিবছর ফিরে আসুক অতিথি পাখির শত শত ঝাঁক। নিরাপদে থাকুক তারা, কোনো শিকারির হাতে যেন প্রাণ না হারায় এ সব পাখি। তাদের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকুক দিঘি, জলাভূমি ও সবুজের আশ্রয়। শীত এলেই ভোরের নীরবতা ভেঙে আকাশজুড়ে উঠুক পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কলকাকলিতে জেগে উঠুক উলুপুর গ্রাম। পাখি বাঁচুক, জলাভূমি বাঁচুক; বেঁচে থাকুক প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্য।