লটারি হয়নি ৮ মাস, ফের আবেদন নেওয়ার উদ্যোগ

হবিগঞ্জে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৩২টি আবাসিক প্লটের বিপরীতে প্রায় ৭শটি আবেদন জমা পড়লেও সাত মাসেও লটারির আয়োজন করা হয়নি। প্লট পাওয়ার আশায় আবেদনকারীরা যখন দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায়, তখনই অদৃশ্য কারনে লটারি স্থগিত রেখে নতুন করে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।

‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে হবিগঞ্জ শহরতলীর ধূলিয়াখালে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের অধীনে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির ডিডিপি অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়নের জন্য মাটি ভরাটের কাজও সম্পন্ন করেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

‎চলতি বছরের প্রথম দিকে প্লট বরাদ্দের জন্য বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান করা হয়। আড়াই থেকে পাঁচ কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের মোট ১৩২টি প্লটের বিপরীতে এক হাজার টাকা মূল্যের আবেদনপত্র বিক্রি হয় প্রায় ১১শ টি। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। চার কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের প্লটের জন্য দুই লাখ টাকা এবং চার কাঠার নিচের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের অনুকূলে জমা হওয়া এই জামানতের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

‎আবেদন গ্রহণের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত লটারি অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্লট প্রত্যাশীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ জামানতের টাকা দীর্ঘদিন কর্তৃপক্ষের কাছে পড়ে থাকায় ক্ষোভও বাড়ছে।

‎নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, লটারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে হবিগঞ্জের একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা পুনরায় আবেদন গ্রহণের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রীকে অনুরোধ করায় লটারি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। শিগগিরই পুনরায় আবেদন গ্রহণের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। নেতার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদার বলেন, “নতুন করে আবেদন নেওয়ার বিষয়টি শুনতেছি। তবে এখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি।”

‎এদিকে নতুন করে আবেদন গ্রহণের উদ্যোগের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এরই মধ্যে আবেদন করা প্লটপ্রত্যাশীরা। শিপা আক্তার নামে এক আবেদনকারী বলেন, “এ ধরনের কর্মকাণ্ড নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থী। যেখানে ১৩২টি প্লটের বিপরীতে প্রায় সাত গুণ আবেদন জমা পড়েছে, সেখানে প্লটের সংখ্যা না বাড়িয়ে কেন পুনরায় আবেদন গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—তা বোধগম্য নয়।”

‎আরেক আবেদনকারী এনাম বলেন, পুনরায় আবেদনের সুযোগ দেওয়া মানেই দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার পাঁয়তারা কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

‎আবেদনকারীদের দাবি, ইতোমধ্যে যারা নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন এবং জামানত দিয়েছেন, তাদের আবেদন বহাল রেখে দ্রুত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহলের সুপারিশে লটারি স্থগিত না করে প্রকল্পের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

‎অভিযোগের বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব মো. জি কে গউছ বলেন, “নতুন করে আবেদন নেওয়া হলে ক্ষতি কী? হাজার হাজার আবেদন বিক্রি হলে সরকারের কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবেদন নেওয়া হয়েছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমি চাই আরো বেশি আবেদন পড়ুক। তবে নিরপেক্ষভাবে লটারি হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”

‎সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন এডভোকেটের মতে এভাবে নিয়ম ভাংগা হলে সব কিছুতেই অনিয়ম হতে থাকবে। হবিগঞ্জে আবাসিক সংকট আছে। প্লটের সংখ্যা না বাড়িয়ে প্রায় ৭ গুন বেশী আবেদন পাওয়ার পরেও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ আবার আবেদনের সুযোগ দেওয়া মানেই সময় ও অর্থ নষ্ট করা। এদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান মোসাম্মৎ ফেরদৌসী বেগমের সাথে আলাপ করলে তিনি জানান উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশের প্রেক্ষিতে নতুন আবেদন গ্রহণের বিজ্ঞপ্তি শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। আবেদনের সময় থাকবে ২১ দিন। স্বচ্ছতার সাথে লটারি হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি ।