ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছর মেয়াদ পূর্তি উপলক্ষে নিজেদের কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরেছেন ডাকসুর নেতারা। তাদের দাবি, এক বছরে পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, আইনি সহায়তা, আবাসিক হল, পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে হাজারের বেশি কাজ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের অসহযোগিতার কারণে সেগুলোর কিছু এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ) ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক বছরের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম। এ সময় ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মু. মহিউদ্দিন খানসহ অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, দায়িত্ব পালনের পুরো বছরের কাজকে তারা ৪১টি ভাগে ভাগ করেছেন। এসব খাতে এক বছরে হাজারের বেশি কাজ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবাসন সংকটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম মৌলিক সমস্যা উল্লেখ করে সাদিক কায়েম বলেন, আবাসন সংকটকে ১০৫ বছর ধরে কৃত্রিমভাবে তৈরি করে রাখা হয়েছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ডাকসু ভবনের বহুতল ভবন নির্মাণ, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতে ১৯টি শাটল চালুর কথা জানান এই ডাকসু নেতা। চালু হয়েছে আন্তজেলা বাস সার্ভিস, মেয়েদের বিশেষ বাস সার্ভিস ও বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ট্রিপ। ক্যাম্পাসে চলাচলকারী বিভিন্ন বাহনের চালকদের তালিকা, পোশাক ও ভাড়ার চার্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, বহিরাগত নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাস বাস্তবায়নেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ক্যাম্পের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ৬৫ বছর ধরে মসজিদটি সংস্কার করা হয়নি। প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে এটি সংস্কার করা হয়েছে। চীনের ৩১টি কোম্পানিতে ৪৩০ জনকে চাকরির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারে বিসিবির পক্ষ থেকে দুই কোটি টাকার বরাদ্দ আনা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের অংশ হিসেবে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, এক বছরে ১ হাজার ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালানো শেখানো হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে ১২০টির বেশি কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এক বছরে ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার শতাধিক শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রীদের হলগুলোর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে বিভিন্ন করণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাছাড়া, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার ও জিমনেসিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্রেস্টফিডিং রুম তৈরি হয়েছে। ডে-কেয়ারের জন্য বাজেট আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ডাকসু ভিপি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন কমনরুম আধুনিকায়নের পাশাপাশি ছারপোকা ও মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং হল সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি হলে ফ্রিজ স্থাপন করা হয়েছে।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান সাদিক কায়েম। সংস্কৃতি ও প্রকাশনা খাতেও বিষয়ভিত্তিক সাহিত্য, সাময়িকী ও বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই খাতে ২৮টি প্রকাশনা ও অর্ধশতাধিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। চালু হয়েছে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি।
রেজিস্ট্রার ভবনের সেবা সহজীকরণ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন লাইব্রেরিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সাদিক কায়েম। পাশাপাশি অ্যালামনাইদের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কার এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সাদিক কায়েম বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গ্রিন ক্যাম্পাস বাস্তবায়নে ডাস্টবিন স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণেও কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা পাননি বলে জানান তিনি।
ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনের মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিএসসিতে স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রিসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
ডাকসু ভিপি বলেন, এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় এ এফ রহমান হলের প্রবেশদ্বার, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, পুকুরপাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাস্তবায়ন হয়নি যেসব উদ্যোগ
ডাকসু ভিপি বলেন, সব হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, এআই ও প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাবসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মাঠ সংস্কার প্রকল্প ও ডিজিটাল সার্ভের কাজও বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া, রেজিস্টার্ড রিকশা চালু, পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পুরোনো যানবাহন নিলামে দিয়ে দুটি মিনিবাস ও দুটি মাইক্রোবাস কেনার উদ্যোগ অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের অসহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন ডাকসুর ভিপি ও জিএস।
ক্যাম্পাসের আটটি গেটে ট্রাফিক সহায়তার জন্য ডিএমপির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে বলে দাবি করেন ডাকসুর নেতারা।
জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে সাদিক কায়েম বলেন, তারা ক্ষমতা বা চেয়ার আঁকড়ে বসে থাকতে চান না। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর জনপরিসরে এসে জবাবদিহি করার একটি নজির তারা তৈরি করেছেন। ডাকসুর ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রাখতে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।