আবাহনী মাঠ এখন সবার

ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের নিয়ন্ত্রণ আর আবাহনীর কাছে থাকছে না। চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পূরণ না করা এবং অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে আবাহনী ক্লাবের সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি বাতিল করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মাঠটির সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে। একই সঙ্গে ধানমন্ডি মাঠও হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামী ৫ বছর সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এক স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে গতকাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক মো. দৌলতুজ্জামান খাঁন, এনডিসি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম, যুগ্মসচিব মোহাম্মদ হাসানসহ উভয় মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, চুক্তির মেয়াদ ৫ বছর শেষ হলে পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তির মেয়াদ নবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে। মাঠ দুটির উন্নয়ন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দেশের ক্রীড়া ক্লাবগুলো যেভাবে রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে চায় সরকার। নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে মাঠগুলো খেলাধুলার মানোন্নয়ন ও খেলোয়াড় তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডির মাঠ দুটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এগুলো কোনো একটি ক্লাব বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। শিশু, তরুণ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যাতে নিরাপদ পরিবেশে খেলাধুলা করতে পারে, তা নিশ্চিত করা হবে।’

আবাহনী মাঠে ফুটবল ও ক্রিকেট মাঠের পাশাপাশি বাস্কেটবল কোর্ট, জিমনেসিয়াম, ক্লাব টেন্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রয়েছে। এসব স্থাপনা ভেঙে না ফেলে সংস্কার করে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। আমিনুল হক বলেন, ধানম-ি মাঠের বিদ্যমান অবকাঠামোও উন্নত করা হবে। সেখানে আরচারি, শুটিং, ফুটসাল, প্যাডেল ও পাঁচজনের হকির জন্য ছোট টার্ফ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এসব মাঠকে কেবল একটি নির্দিষ্ট খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা হলে মাঠগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় খেলার সুযোগ তৈরি এবং ক্রীড়া চর্চাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। দেশের ক্রীড়া অবকাঠামোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন খেলার মাঠগুলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের লক্ষ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাকারিয়া তাহের বলেন, আমাদের লক্ষ্য রাজধানীর খেলার মাঠগুলোতে সর্বস্তরের মানুষের জন্য খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা। যা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সর্বস্তরের মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আবাহনী মাঠ নামে পরিচিত ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠটি এতদিন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিয়ে পরিচালনা করত আবাহনী লিমিটেড। ক্লাবটি ১৯৯৬ সালে মাঠের ৯ দশমিক ৭৬ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা চেয়ে আবেদন করেছিল। ১৯৯৮ সালে মাঠের সিংহভাগ জমি এবং ২০১০ সালে আরও শূন্য দশমিক ৮৯ একর জমি ইজারা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ইজারাভুক্ত জমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৬৫ একর।

ইজারার অর্থ কয়েক বছর ধরে পরিশোধ না করা এবং ইজারার শর্তভঙ্গের অভিযোগের পর মাঠটির নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ইজারা বাতিলের পর মাঠটি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, জায়গাটি খেলাধুলার কাজে ব্যবহার করার কথা ছিল। বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণেও বিধিনিষেধ ছিল।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কের মাঠটির ব্যবস্থাপনাও এত দিন ভিন্ন ছিল। মাঠটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে থাকলেও দীর্ঘদিন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব সেটি ব্যবহার ও কার্যত নিয়ন্ত্রণ করেছে। পরে ক্লাবটির নাম পরিবর্তন করে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাব করা হয়।