কুমিল্লায় ভরাট হয়ে গেছে শত শত পুকুর-দীঘি

একসময়ের ‘ব্যাংক ও ট্যাংক’-এর (দীঘি-পুকুর) শহর কুমিল্লায় দিনে দিনে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে পুকুর ও জলাশয়। নদী-খাল ও জলাশয় রক্ষায় আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে বছরের পর বছর ভরাট করা হয়েছে পুকুরগুলো। স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণেই প্রতিনিয়ত দীঘি, পুকুর ও জলাধার ভরাটের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।  হারিয়ে গেছে নগরীর ঐতিহ্যবাহী অনেক দীঘি ও পুকুর। তবে বর্তমানে ভরাট বন্ধ ও জলাশয় রক্ষায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) তালিকা তৈরির পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ২৭টি ওয়ার্ডে বর্তমানে ৭৮০টি পুকুর ও দীঘি রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ তালিকায় থাকা পুকুরগুলোর একটি বড় অংশই এরই মধ্যে পুরোপুরি বা আংশিক ভরাট হয়ে গেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গার পাশাপাশি জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি দপ্তরগুলোও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ওয়ার্ডটিতে থাকা ৩২টি পুকুরের মধ্যে ২৫টিই ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, টিনশেডঘরসহ নানা স্থাপনা। এ ছাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডে কারাবন্দিদের ব্যবহারের পুকুর ভরাট, ১০ ও ১১ নম্বর ওয়ার্ডে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার প্রাচীন পুকুর ভরাট এবং ১৬ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডেও বহু পুকুর ভরাটের চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ১৭৭টি পুকুর রয়েছে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে, তবে সেখানেও একাধিক জলাশয় দখলের শিকার।

বছরের পর বছর ধরে এসব ভরাট কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা।

স্থানীয়দের কাছে জানা গেছে, ইউসুফ স্কুলের ভেতরের পুকুর, ডা. নিত্যহরির বাড়ির ভেতরের পুকুর, কাজীবাড়ির পুকুরগুলো সময়ের আবর্তে ভরাট হয়ে গেছে। এ ছাড়া পাকিস্তান আমলে ভরাট হয়েছে ইপিজেড রোডের আনন্দ সাগর দীঘি। শাসনগাছা ডাকবাংলো দীঘিও ভরাট হয়ে গেছে। তালপুকুরপাড়ে দুটি পুকুর ছিল, আজ আর নেই, রায়বাড়ির পুকুর, ভিক্টোরিয়া কলেজের কমন রুমের পাশের পুকুর, সারদা পাল মাঠের পুকুর, ঠাকুরপাড়া জোড়পুকুর, লালা পুস্কুরণী, ঝাউতলা কামিনী কুটিরের পাশের পুকুর, খ্রিস্টানপাড়ার পুকুর, পার্কের ভেতরে ব্যাঙ সাগর। এ রকম পুরো নগরীতেই শত শত পুকুর চোখের সামনে ভরাট হয়ে গেছে। নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবিদরা মনে করছেন, বর্তমানে যেসব পুকুর-দীঘি রয়েছে, তা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন করে পুকুর-দীঘি খননের উদ্যোগ জরুরি। তাহলেই ভবিষ্যতের জন্য বিপর্যয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন নগরীর সচেতন বাসিন্দারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিলম্বে হলেও তালিকা করার জন্য সিটি করপোরেশনকে ধন্যবাদ। তবে এখন প্রধান কাজ তালিকা অনুযায়ী ভরাট হওয়া পুকুরগুলো উদ্ধার করা। যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ম না মেনে জলাশয় ভরাট করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পুকুর-খাল কমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার জায়গা পাচ্ছে না। ড্রেনেজব্যবস্থা উন্নত করার দাবি করা হলেও মূল ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই ভোগান্তি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এখনই যদি অবশিষ্ট জলাশয়গুলো রক্ষা করা না যায় এবং ভরাট হওয়া জলাশয়গুলোর বিকল্প হিসেবে বড় জলাধার তৈরি করা না হয়, তবে আগামী দিনে কুমিল্লার জলজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা নাগরিক ফোরামের সভাপতি ডা. আব্দুল লতিফ বলেন, নগরীতে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ প্রাকৃতিক জলাশয় ও পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়া। সেই সঙ্গে পানি যাওয়ার খালগুলোও দখল হয়ে গেছে। তাই খালগুলো উদ্ধার করে এবং জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে তুলতে হবে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আবু সায়েম ভূঁইয়া বলেন, পানিপ্রবাহের খালগুলো দখলের কারণে সরু হয়ে গেছে। এতে বৃষ্টি হলে পানির প্রখরতা বাড়লেও তা নামতে বাধা পায় এবং জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন জানান, ২৭টি ওয়ার্ডের সচিবদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা সন্নিবেশ করা হয়েছে। শিগগিরই আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

জলাশয় সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, পুকুর ভরাটের খবর পেলেই আমরা বাধা দিচ্ছি। কোনোভাবেই নতুন করে পুকুর ভরাট করতে দেওয়া হবে না। সিটি করপোরেশন এখন এ তালিকা ধরে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ করবে।