অপরাধে এবার ‘শিশু গ্যাং’

১০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টা। কারওয়ান বাজার রেললাইন-সংলগ্ন মাছের আড়তের সামনে এক পথচারীকে ঘিরে ধরে চারজন শিশু। তাদের বয়স আনুমানিক আট থেকে ৯ বছর। তারা ওই পথচারীকে ছুরি ধরে মোবাইল ফোন ও ১ হাজার টাকা নিয়ে যায়। পথচারীর চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। বীরদর্পে ওরা চলে যায় রেললাইনের ঘুপচি ঘরের ভেতর। একই ঘটনা ঘটেছে গত মাসের শেষ সপ্তাহে, উত্তরার আব্দুল্লাহপুরে দুই শিশু বাসের জানালা দিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে যায় এক যাত্রীর। শুধু কারওয়ান বাজার বা আব্দুল্লাহপুর নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের মতোই শিশু গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে গেছে। কিশোর অপরাধীদের মতোই ওরা বেপরোয়া আচরণ করছে। চোখের সামনেই দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে এই শিশু গ্যাং। কিশোর গ্যাংয়ের পরিবার বা ঠিকানা থাকলেও শিশু গ্যাংয়ের অধিকাংশই ভাসমান এবং অভিভাবকহীন।

এই নিয়ে পুলিশে নতুন করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। ইতিমধ্যে পুলিশের একটি ইউনিট গোপন বার্তা দিয়ে বলেছে, ভাসমান শিশুরা এসব অপকর্ম করছে। ওরা চুরি-ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে। বস্তি-ফুটপাতসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আস্তানা গাড়ছে। তারা পথচারীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। একেকটি এলাকায় তারা গ্রুপ তৈরি করে অপরাধও চালাচ্ছে। কিশোর গ্যাংকে ছাপিয়ে শিশু গ্যাংয়ের বিস্তার নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। 

পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে এসব গ্রুপের অপরাধের ধরন ও বিস্তার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনমনেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একসময় পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ আড্ডা, মারামারি কিংবা আধিপত্য বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা শিশু গ্রুপ এখন চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধসহ হরেক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে পুলিশ ও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে কিশোর অপরাধীরা। চলতি বছর পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর ৫০টি থানায় ১১৮টি কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি শিশু গ্যাংও সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্করাও তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বা তদারকিতে সম্পৃক্ত আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিশোরদের পাশাপাশি শিশু গ্যাংও থাকার তথ্য পাচ্ছি। তাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আশা করি, দ্রুত এসব অপরাধীকে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, শিশু গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিনতাই ও চুরির। ঢাকার মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা কিশোর গ্যাং ও শিশু গ্যাংয়ের উৎপাতের অভিযোগ করেছেন। গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছে। বস্তি, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাদের আস্তানা সবচেয়ে বেশি। এসব জায়গায় বসবাসকারী অরক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটি অংশ অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।

পুলিশের একটি গবেষণায় শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দরিদ্র্যতা, অপরাধপ্রবণ বন্ধু বা সহপাঠী এবং শিক্ষার সুযোগের ঘাটতিকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী বড় ভাই, দলগত পরিচয়, সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের আকাক্সক্ষা থাকছে কারোর মধ্যে।

এই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কোনো এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক সরবরাহ, অবৈধ দখল বা অন্য অপরাধের অর্থনৈতিক সুযোগ থাকে, তাহলে নতুন সদস্য সংগ্রহের প্রণোদনাও থাকছে। শিশু-কিশোরদের সহজে প্রভাবিত করা হচ্ছে। তারা অপরাধী চক্রের কাছে তুলনামূলকভাবে সহজ টার্গেট হচ্ছে। গ্যাংয়ের সদস্যরা পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে শিশুদের অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কিশোর অপরাধীদের মতোই শিশু গ্যাং একই ধরনের অপরাধ করছে। শিশু গ্যাংয়ের সদস্যরাই একসময় কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত হয়ে যায়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তারা কিশোর গ্যাংয়ের মতো অভিযাত পরিবারের না। বেশিরভাগই ভাসমান। তারা ফুটপাত ও বস্তিতেই থাকে বেশি।  তাদের নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ এবং তাদের আটক করে সংশোধনাগারে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, পরিবার, কাউন্সেলিং ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি না করলে দীর্ঘমেয়াদে ফল পাওয়া কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর, বিশ^রোড, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেল স্টেশন, হাইকোর্ট এলাকাসহ শতাধিক স্থানকে অপরাধের জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তি, জুরাইন বালুর মাঠ বস্তি, গোপীবাগের টিটিপাড়া বস্তি, মালিবাগের কুমিল্লা বস্তি, মোহাম্মদপুরের বালুর মাঠ বস্তি, মালিবাগের রেললাইন বস্তি, খিলগাঁওয়ের নোয়াখাইল্লা বস্তি, মীর হাজিরবাগ বস্তি, ধলপুর সিটিপল্লী বস্তি, নামাশ্যামপুর বস্তি, গে-ারিয়ার রেললাইন বস্তি, পার গে-ারিয়া বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তি, পোস্তগোলা ডিআইটি বস্তি, ডেমরার চরপাড়া বস্তি, পূর্ব দোলাইরপাড় ডিপটি গলির বস্তিসহ বেশিরভাগ বস্তিতেই শিশু গ্যাংয়ের সদস্যরা থাকছে। প্রকাশ্যেই তারা মাদক বেচাকেনা করে। এসব অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার শঙ্কাও আছে। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, টাঈাইল, ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের টঙ্গী, কুষ্টিয়া এলাকায় কিশোরদের পাশাপাশি শিশু অপরাধীর কর্মকা- আছে। ওইসব অঞ্চলের বস্তিতে বা নিম্নজায়গায় বেশি বসবাস তাদের।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশু ও কিশোর অপরাধীদের নিয়ে সম্প্রতি একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, এসব অপরাধী দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা গ্যাং তৈরি করছে। তাদের বেশিরভাগই ভাসমান। তাদের পরিবারেরও খোঁজ নেই। প্রায়ই ওরা নেশাগ্রস্ত থাকে। তিনি আরও বলেন, জেলা ও মহানগর এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকায় বিভাগীয় শহরে এসব অপরাধীর সংখ্যা বেশি। সারা দেশে ৪৫ হাজারের মতো বস্তি আছে। এর মধ্যে রাজধানীতে আছে ১১০টি। এসব বস্তিতেই ভাসমান অপরাধী হয়ে উঠছে শিশু গ্রুপের সদস্যরা। তা ছাড়া বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও ফুটপাতেও থাকছে তারা।

অপরাধ বিশ্লেষক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশু-কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাই বেশি দায়ী। অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ অসৎ সঙ্গ। এ ছাড়া জীবিকার জন্য নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশু-কিশোররা ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা মাদক সেবন কিংবা অ্যাডভেঞ্চার থেকেও এসব অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। 

একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, শিশুদের বয়স নানাভাবে অপব্যবহার হচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশু, কিশোররা নানাভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু আইন করে বা সাজা দিয়ে অপরাধ থেকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকে নজর দিতে হবে।