বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অসহায় রোগী

চারদিকে নদী-সাগরবেষ্টিত ও মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ ভোলার মনপুরা। এখানকার গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগও সীমিত। এমন বাস্তবতায় মনপুরার সোয়া লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ সেই হাসপাতালেই চিকিৎসক আছেন মাত্র চারজন। ৩৪টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ২৫টিই শূন্য। চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারীসহ অনুমোদিত ১২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৪৮ জন। ফলে শয্যা না পেয়ে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়িতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।

দ্বীপবাসীর জন্য হাসপাতালটি শুধু একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়; ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এটি তাদের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়। কিন্তু জনবল ও অবকাঠামোর সংকটে সেই আশ্রয়ই এখন নাজুক। প্রতিদিন বহির্বিভাগে তিন শতাধিক এবং আন্তঃবিভাগে গড়ে ৭৫ থেকে ৮০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। এত বিপুল রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে মাত্র চার চিকিৎসককেই দিতে হচ্ছে সেবা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৪টি। এর মধ্যে ২৫টি শূন্য। পদায়ন থাকা চিকিৎসকদের কয়েকজন বিভিন্ন কারণে ছুটিতে থাকায় বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন। নার্স ও মিডওয়াইফের ৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৮ জন। তৃতীয় শ্রেণির ৩৭টি পদের মধ্যে ২৫টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে ১৪টি পদ শূন্য। চিকিৎসক থেকে শুরু করে সহায়ক কর্মী প্রায় প্রতিটি স্তরেই জনবল ঘাটতি থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি ২০১৪ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু শয্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে কাগজে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়লেও রোগী সামলানোর বাস্তব সক্ষমতায় রয়ে গেছে বড় ঘাটতি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের ওপর।

সম্প্রতি উপজেলার বিচ্ছিন্ন কলাতলি চর থেকে সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে আসেন ছিদ্দিকুল্লাহ, আব্দুর রশিদ ও লোকমান। তাদের সন্তানদের দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কোনো শয্যা পাননি। বাধ্য হয়ে সিঁড়ির র‌্যাম্পে ফোম বিছিয়ে সন্তানদের চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।

তারা বলেন, হাসপাতাল থেকে ফোম দেওয়া হলেও বিছানোর জন্য কোনো বেডশিট দেওয়া হয়নি। তারা দরিদ্র মানুষ। সামর্থ্য থাকলে সন্তানদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভোলা শহর, বরিশাল কিংবা ঢাকায় নিয়ে যেতেন। কিন্তু মনপুরা থেকে বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়াই তাদের জন্য বড় সংকট।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দক্ষিণ সাকুচিয়া ও মনপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. নাছির, খলিল, সাগর ও দুলালও একই ভোগান্তির কথা জানান। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও শয্যা না পাওয়ায় বারান্দায় বিছানা করে থাকতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন একজন চিকিৎসক এসে রোগী দেখে গেলেও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাদের।

স্থানীয়দের কাছে সংকটটি আরও গুরুতর হওয়ার কারণ মনপুরার ভৌগোলিক অবস্থান। চারদিকে নদীঘেরা এই উপজেলায় গুরুতর রোগীকে দ্রুত অন্যত্র নেওয়া সহজ নয়। নদীপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের পর নৌযান না থাকলে জরুরি রোগী নিয়ে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকলে রোগীর সামনে বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়ে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ‘ভোলা থেকেই মনপুরা বিচ্ছিন্ন; তার ওপর চারদিকে নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। গুরুতর রোগীকে দ্রুত মূল ভূখন্ডে নেওয়া কঠিন। তাই মনপুরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।’

ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী না থাকলে দ্বীপবাসীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবেই। দ্রুত শূন্য পদে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

স্থানীয়দের দাবি, নদী-সাগরবেষ্টিত এই দ্বীপের সোয়া লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় এখানে একটি কার্যকর হাসপাতাল জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের শূন্যপদ পূরণ, ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কবির সোহেল বলেন, ‘হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন এবং বহির্বিভাগে প্রায় তিন শতাধিক রোগী চিকিৎসা নেন। চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৬১ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। পদায়ন থাকা চিকিৎসকদের মধ্যেও কয়েকজন ছুটিতে থাকায় বর্তমানে মাত্র চারজন চিকিৎসক দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্সসহ জনবল পাওয়া গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।’