হারিয়ে যাচ্ছে মুরাদনগরের ঐতিহ্য ‘ঝাঁকি জাল’!

এক সময় বর্ষা এলেই কুমিল্লার মুরাদনগরের নদী-খাল, বিল ও জলাশয়ে দেখা যেত ঝাঁকি জাল হাতে মাছ শিকারের চিরচেনা দৃশ্য। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে ঝাঁকি জাল নিয়ে পানির ধারে ছুটতেন জেলে ও শৌখিন মাছ শিকারিরা। পানিতে জাল ছুড়ে দিয়ে মাছ ধরার সেই দৃশ্য ছিল গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে চিত্র। গোমতী, তিতাস ও আর্সি নদীঘেরা মুরাদনগরে এখন আগের মতো চোখে পড়ে না ঝাঁকি জাল। নদী-খাল ও জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় অনেক জেলেই ছেড়ে দিয়েছেন এই ঐতিহ্যবাহী জাল।
অন্যদিকে খাল, বিল ও নদীতে বেড়েছে আধুনিক ও ক্ষুদ্র ফাঁসের বিভিন্ন জালের ব্যবহার।

বিশেষ করে ‘চায়না দুয়ারি’ বা ‘ম্যাজিক জাল’ নামে পরিচিত এক ধরনের মাছ ধরার ফাঁদে নির্বিচারে আটকা পড়ছে ছোট-বড় মাছ ও পোনা। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়ায় জেলেদের একাংশের কাছে এর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে চায়না দুয়ারি জাল নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত মাছ ধরার বিশেষ এক ধরনের ফাঁদ। কোথাও কোথাও একে চায়না জাল, ম্যাজিক জাল বা ঢলুক জালও বলা হয়। ছোট ফাঁসের কারণে এতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পাশাপাশি মাছের পোনাও আটকা পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিক জালের বিস্তার, জলাশয় দূষণ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশি মাছের সংখ্যা কমছে। এর প্রভাব পড়েছে ঝাঁকি জালের ব্যবহারেও।

যেভাবে ব্যবহার হয় ঝাঁকি জাল: প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় মাছ ধরার জনপ্রিয় উপকরণ ঝাঁকি জাল। সাধারণত জালের সঙ্গে ৭-৮ হাত লম্বা একটি সরু রশি বাঁধা থাকে। জালের নিচের অংশে লোহা বা শিসার ছোট ছোট ওজন যুক্ত থাকে। পানিতে ছুড়ে দিলে ওজনের কারণে জাল দ্রুত তলিয়ে গিয়ে মাছ আটকে ফেলে। নদী, খাল কিংবা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে রশি হাতে রেখে জালটি পানিতে ছুড়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর রশি ধরে টেনে জাল তুলে আনা হয়। এতে পুঁটি, চিংড়ি, রুই, কাতলা, গ্লাসকার্প, শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে।

জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত: রামচন্দ্রপুর বাজারের মন্টু মিয়া বলেন, একসময় ঝাঁকি জাল দিয়ে অনেক মাছ ধরেছি। তখন জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ উঠে না। তাই এই জালের ব্যবহারও কমে গেছে। ডুমুরিয়া গ্রামের জেলে নিখিল বর্মন বলেন, তিতাস নদীতে সারা দিন ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরলেও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মাছ পাওয়া যায়। এতে সংসার চালানো কঠিন। আবার ঝাঁকি জাল চালাতেও শারীরিক শক্তি লাগে। তাই এখন এর চাহিদা আগের মতো নেই।

গাজীরহাট এলাকার জেলে স্বপন মিয়া বলেন, আধুনিক বিভিন্ন ধরনের জাল আসায় ঝাঁকি জালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। একসময় এই জাল দিয়ে খাল-বিলে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চালিয়েছি। দিন যত যাচ্ছে, পুরোনো সেই স্মৃতিগুলোও ততই মুছে যাচ্ছে।

মাছ কমার সঙ্গে হারাচ্ছে ঐতিহ্যও: সিনিয়র সাংবাদিক বেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট, ম্যাজিক ও চায়না জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং নদী-সংলগ্ন খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়ায় দেশি প্রজাতির মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি এসব কারণেই ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ শিকারের ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।

একসময় বর্ষার পানিতে জাল ছুড়ে মাছ ধরার যে দৃশ্য মুরাদনগরের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মিশে ছিল, তা এখন অনেকটাই স্মৃতি। জলাশয়ে মাছ কমার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই জাল, সেই কৌশল-আর তার সঙ্গে মুছে যাচ্ছে গ্রামবাংলার এক টুকরো ঐতিহ্যও।