হামে আক্রান্ত জমজ দুই সন্তানকে নিয়ে দেড় মাস ধরে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন চট্টগ্রামের এক দম্পতি। সন্তানদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমানো টাকা শেষ হয়েছে, বিক্রি করতে হয়েছে গয়না। স্বজনদের কাছ থেকে ধার করেছেন তিন লাখ টাকা। এরই মধ্যে চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। এখন হাতে কোনো টাকা না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা বাবা-মা।
চট্টগ্রাম নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার বাসিন্দা গার্মেন্টসকর্মী মিজানুর রহমান ও ইয়াসমিন বেগম দম্পতির বিয়ে হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি তাদের ঘরে জন্ম নেয় জমজ দুই ছেলে ইয়াসিন ও ইয়ামিন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জন্মের পর সাত মাস মোটামুটি সুস্থই ছিল দুই শিশু। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তাদের জ্বর শুরু হয়। ৭ আগস্ট চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে জ্বরের ওষুধ ও নেবুলাইজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরদিন ইয়াসিনের শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এর পরদিন শ্বাসকষ্ট শুরু হয় ইয়ামিনেরও।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর ইয়াসিনের শরীর কালো হয়ে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত একটি বেসরকারি শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউ খালি না থাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করতে থাকেন স্বজনেরা। পরে ১১ আগস্ট ভোরে পেডিকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে একটি শয্যার ব্যবস্থা হয়। সেখানে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে ইয়াসিনকে বাসায় নেওয়া হয়।
তবে তিন দিন পর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি। ১০৪ ডিগ্রি জ্বরের পাশাপাশি মুখে ঘা ও চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, ইয়াসিন হামে আক্রান্ত হয়েছে। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে আবার পেডিকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসাধীন থাকার সময় বাসায় থাকা তার জমজ ভাই ইয়ামিনও হামে আক্রান্ত হয়।
সম্প্রতি চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২৭ নম্বর শয্যায় অন্য একটি শিশুর সঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছে ইয়াসিন। নিচতলার হাম ওয়ার্ডে কোলে সন্তানকে নিয়ে বসে ছিলেন মা ইয়াসমিন বেগম। সেখানে চিকিৎসাধীন ছিল ইয়ামিনও।
ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘দেড় মাস ধরে আমি হাসপাতালে আছি। মাঝখানে মাত্র এক রাত বাসায় ছিলাম। চলতি মাসের ৭ তারিখে ইয়ামিনের চোখে রেশ ও মুখে ঘা দেখা দিলে তাকে সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। পরীক্ষার পর তারও হাম ধরা পড়ে। রাতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে রক্তচাপ ২৫০ এবং অক্সিজেনের মাত্রা ৪৫-এ নেমে যায়। রাত একটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তাকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়।’
তিনি বলেন, ‘এর কিছুক্ষণ পর বাসায় থাকা ইয়াসিনেরও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকেও হাসপাতালে আনা হয়। পরে দুজনকেই ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ইয়ামিনকে প্রথমে ওই ওয়ার্ডের হাম কর্নারে রাখা হলেও পরে নিচতলার হাম ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।’
সন্তানদের চিকিৎসা ব্যয়ের কথা জানিয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘দেড় মাসে আমাদের প্রায় সাত লাখ টাকা শেষ হয়ে গেছে। গায়ের অলংকার যা ছিল, সব বিক্রি করেছি। বোন ও বোনের জামাইয়ের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার করেছি। নিজেদের জমানো টাকাও শেষ। দুই শিশুর হামে আমরা এখন নিঃস্ব। আর কোনো টাকা না থাকায় চমেক হাসপাতালে পড়ে আছি।’
তিনি আরও বলেন, তার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। সন্তানদের চিকিৎসার জন্য দেড় মাস ধরে হাসপাতালে থাকায় তিনিও নিয়মিত কর্মস্থলে যেতে পারছেন না।
হামের সংক্রমণ বাড়ছে চট্টগ্রামে
চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা ও মহানগর মিলিয়ে সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৭৫২ জন। জেলার ১৫টি উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৩৭০ জন।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৭৬ জন। পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৭৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। নিশ্চিত হামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হাম গবেষক ডা. কামরুন নাহার বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ জনের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত রোগীকে আইসোলেশনে রাখা জরুরি। সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, হাম শনাক্ত হওয়ার আগেই বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তরা সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে তাদের সংস্পর্শে এসে অন্য রোগীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরও অনেকে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা করা গেলে সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়াও সহজ হবে।