বিরোধের গুলিতে বলি সাধারণ মানুষ

গত ৭ মে রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদের বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনির একটি দোকানে পান কিনতে বের হয়েছিল ১১ বছরের রেশমি আক্তার। কয়েক কদম এগোতেই একদল দুর্বৃত্ত হাসান রাজু (২৪) নামের এক যুবককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। আতঙ্কে সবাই দিগি¦দিক ছুটতে থাকেন। ছোট্ট রেশমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি তার বাঁ চোখ ভেদ করে মাথায় ঢুকে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান হাসান রাজু। আর গুরুতর আহত রেশমি সাতদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমায়। দুর্বৃত্তের টার্গেট না হয়েও বিরোধের গুলি কেড়ে নিল রেশমির জীবন।

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সরদার গলিতে হেলমেট পরা একদল সশস্ত্র যুবক সাগর খান ইমরান (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে এলোপাতাড়ি গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন ইমরান। আরও গুলিবিদ্ধ হন পাশেই থাকা রিকশাগ্যারেজ ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ জাকারিয়া (৩২)। 

এর আগে ৩০ আগস্ট গেন্ডারিয়ার করাতীটোলা এলাকায় মাদক নিয়ে স্থানীয় মনির হোসেন ও অটো সজলের বিরোধে গোলাগুলিতে চা-দোকানি আলমগীর (৩৩) ও দুই পথচারী সিয়াম (১৮) ও আশা আক্তার (২০) গুলিবিদ্ধ হন।

শুধু এগুলোই নয়, চলতি বছরের গত ৮ মাসে রাজধানীতে অন্তত ১৪টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে ছয়জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। ৮ মাসে সারা দেশে আরও ১১৩টি গুলির ঘটনায় ৫৪ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ৩৭টি ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। এরপর চট্টগ্রামে ২৮টি এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। তুচ্ছ বিরোধ, মাদক কারবার, আধিপত্যের লড়াই, চাঁদাবাজি কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে প্রকাশ্যেই চলছে গুলি। এতে টার্গেট ব্যক্তির পাশাপাশি আক্রান্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষও। জড়িতদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে অস্ত্রের জোগানদাতারা। ফলে বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক। বাইরে বেরিয়ে কোনো পক্ষের বিরোধের গুলিতে প্রাণ হারানোর শঙ্কা যেন এখন নিত্যসঙ্গী।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি গুলির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এসবের পেছনে যারা রয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।’ আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কারও কাছে অস্ত্র থাকলে তা দিয়ে যেকোনো অপরাধ ঘটাতে পারে। তাই প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। মামলা দায়ের করা হচ্ছে।’ 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিককালে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বেপরোয়া ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। অপরাধী চক্রগুলো নানা উৎস থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে মজুদ গড়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নেয় অপরাধীরা। ওই সময় সীমান্তের চোরাপথে ঢুকে পড়ে প্রচুর অস্ত্র। সেসব অস্ত্রসহ আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার হতে দেখা যায়। এমনকি গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্রও অপরাধীদের হাতে চলে যায়।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় বিভিন্ন ধরনের পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৩১১টি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ তুচ্ছ বিরোধের ঘটনায়ও অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।

আহতদের অবস্থা : বিরোধের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে বদলে গেছে অনেকের জীবন। কেউ পুরোপুরি সুস্থ হননি, কেউ বয়ে বেড়াচ্ছেন ক্ষতের চিহ্ন, কেউ মানসিক ট্রমায় হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের ছন্দ। কাজ করতে না পারায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারও।

গত ২৫ জুলাই কাফরুলে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালায় একদল ভাড়াটে খুনি। বাবু রক্ষা পেলেও এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী (৪৫)। আহত হন ফুটপাতের কাঁচামাল ব্যবসায়ী নালাম সর্দার (৪৫) ও কাপড় ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩২)। আজও সুস্থ হয়ে ওঠেননি নালাম।

নালামের বড় ছেলে মো. সজীব সর্দার বলেন, ‘একটি গুলি বাবার মাথার ওপরের অংশ দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে গেছে। তিনবার অপারেশনের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। চতুর্থবার চিকিৎসকরা মাথার খুলি খুলে ফেলেছেন। এতে কিছুটা ঘা শুকিয়েছে। তিন মাস পর খুলি লাগানোর কথা জানিয়েছেন তারা। তবে দীর্ঘদিন খুলি খুলে রাখলে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে নতুন খুলি কিনতে ৪-৫ লাখ টাকা লাগবে। ইতিমধ্যে গ্রামের ভিটা বিক্রি করে ৭ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে টানা ১ মাস ৪ দিন চিকিৎসার পর বাবাকে বাসায় আনি। আবার সমস্যা দেখা দিলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। মাথার সিটি স্ক্যান করাতে হবে। বাবা-আমি একসঙ্গে ফুটপাতে দোকান করতাম। এখন দোকান করব, নাকি বাবার চিকিৎসা নিয়ে দৌড়াব সেটাই বুঝতে পারছি না।’

সেদিন গুলিতে নিহত ইউসুফ আলীর বড় ভাই সুমন আহমেদ বলেন, ‘আমরা তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে ইউসুফ ছোট। সবার আদরের ছিল। বিনা অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মা ইউসুফ, ইউসুফ বলে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছেন। যতই আসামি ধরুক, শাস্তি দিক, আমার মা তার ছেলেকে তো আর ফিরে পাবেন না। এই শূন্যতা কি পূরণ হবে!’

৩০ আগস্ট গে-ারিয়ার ঘটনায় চা-দোকানি আলমগীরের কপালের ওপরের অংশে গুলি লাগে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হয়। পাঁচ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও আগের আলমগীর আর নেই। আলমগীরের স্ত্রী জান্নাতি আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে থেকে ফেরার পর মাত্র একদিন দোকান খুলেছেন। চায়ের কেটলিও ঠিকমতো তুলতে পারেন না, বুকে ব্যথা করে। সামান্যতেই সে রেগে যায়, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করে। অথচ আগে এমন ছিল না।’ স্বামীর আয়ে চলা সংসার এখন ধারদেনায় চলছে। সামনে কীভাবে দিন কাটবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা জান্নাতি।

গত ৬ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে গুলিতে আহত জাকারিয়ার স্ত্রী ঝিনুক আক্তার বলেন, ‘তার বাম পায়ের হাঁটুতে এবং ডান হাতের কবজিতে দুটি গুলি লাগে। এখনো চিকিৎসাধীন। জানি না পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন কি না। লোকটা সুস্থ না হলে কীভাবে সংসার চলবে, দুশ্চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না।’

যেসব কারণে গোলাগুলি : ৮ মাসের গোলাগুলির ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চাঁদা দাবি, পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা এবং ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করেই বেশি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিরোধের টার্গেট ব্যক্তি নিহত বা আহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাড্ডার ময়নারবাগ বউবাজার এলাকায় বাসায় ঢুকে মো. রানা (৩৫) নামে এক যুবকের পায়ে গুলি করে একই এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের ছেলে তামিম। রানার বড় ভাইয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা চেয়ে না পেয়ে এ ঘটনা ঘটানো হয়। গত ১৯ মে চাঁদা না দেওয়ায় মতিঝিলে পশুর হাটের ইজারাদারের অফিসে গুলি চালানো হয়। এর আগে ১৪ জানুয়ারি বাড্ডায় চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন ভবনে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। ১০ আগস্ট চট্টগ্রামের মুরাদপুরের হামজারবাগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে প্রবাসীর বাড়িতে গুলি করা হয়। চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে আটটি গুলির ঘটনা ঘটে।

গুলির ঘটনাগুলোর বড় একটি অংশের সঙ্গে স্থানীয় আধিপত্যের যোগসূত্রও পাওয়া গেছে। কোথাও এলাকা নিয়ন্ত্রণ, কোথাও দীর্ঘদিনের বিরোধ, আবার কোথাও প্রভাব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। নরসিংদীর রায়পুরায় চলতি বছরে অন্তত তিনটি গুলির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ জুন সকালে উপজেলার হরিপুর ও দড়িগাঁও এলাকায় সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণ যায়; তাদের তিনজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। একই উপজেলায় ৫ ফেব্রুয়ারি দুপক্ষের সংঘর্ষে ১৪ বছরের শিশু মোস্তাকিম এবং ২ আগস্ট সওদাগরকান্দি এলাকায় সংঘর্ষে কৃষক মোমেন মিয়া নিহত হন। ২৬ জুন পাবনায় পদ্মার চরে আধিপত্যের বিরোধে গুলিতে মঞ্জু শেখ নিহত হন। এ ছাড়া ৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষে তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পশ্চিম সরল এলাকায় ৩১ জুলাই লবণমাঠ ও মাছের ঘের দখল নিয়ে সংঘর্ষে জিল্লুর রহমান নামে এক যুবক নিহত হন। পূর্ববিরোধের জেরে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর খোঁজাপুরে গোলাম মোস্তফাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটি অস্থির সমাজের মধ্যে আছি। অস্থির সমাজে এমন বিশৃঙ্খলা ঘটবেই। প্রতিটি অপরাধের মূল জায়গায় গেলে দেখা যাবে, অর্থনৈতিক সংকট ও নানা অসংগতির কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। অস্ত্রের জোগানদাতারাও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এসব বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই, রাজনৈতিক কারণে পুলিশও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। গোলাগুলিতে সাধারণ মানুষের আক্রান্ত হওয়া ঠেকাতে পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি অনেক দেশেই করা হয়।’