তিন শিক্ষার্থী, ২১ শিক্ষক

শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত থাকার কথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু কুড়িগ্রামের উলিপুরের নিজাইখামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খাতা-কলমে শিক্ষার্থী ভর্তি থাকলেও বাস্তবে ক্লাসরুমগুলো একবারে ফাঁকা। মাদ্রাসায় মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী যারা নিয়মিতই আসে। কিন্তু ক্লাস হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা আর নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার কারণে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার তাগিদে আসে, তাদের ফিরতে হচ্ছে চরম হতাশা নিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা আর শিক্ষকদের উদাসীনতায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

নিজাইখামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আখি মনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাদ্রাসায় কোনো ছাত্রী আসে না। প্রতিদিন আমি একাই আসি আর ঘুরে যাই। কোনো ক্লাসও হয় না। ক্লাসে ১১ জন ছাত্রী ভর্তি থাকলেও মাঝে মাঝে মিম আক্তার, মনিরা বেগম আসে। আর কেউ আসে না।’ একই অভিযোগ অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফি বেগমের। তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে দু-একটি ক্লাস হয়। এ অবস্থায় মাদ্রাসায় আসি কী হয়। বাবা-মায়ের চাপে আসি। এটাকে কি মাদ্রাসা বলে। ভর্তি হয়ে জীবনটাই মাটি হয়ে গেল।’

সরেজমিন ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট নিজাই খামার বালিকা মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা গেল চারদিক সুনসান নীরবতা। নেই কোনো শিক্ষার্থীর কোলাহল। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বারান্দায় তিনজন শিক্ষার্থী খেলছে। তারা জানান, আমরা ছাড়া কেউ আসে না। মাঠে বড় ঘাস ও ভিতরের পরিবেশ দেখলেই খুব সহজে বোঝা যায় শিক্ষার্থীর দৈন্যতা কতটা তীব্র। অফিস কক্ষে গিয়ে দেখা মিলল ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষকের। তারা বসে বসে গল্প করছেন। উপস্থিত আছেন মাদ্রাসার সভাপতি মোহাম্মদ আলী। তিনি ইতিপূর্বে এই মাদ্রাসার সুপার ছিলেন।

সুপারের কাছে শিক্ষার্থী না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান গ্রামের প্রতিষ্ঠান মেয়েরা আসতে চায় না। মাঝেমধ্যে হোম ভিজিট করি তখন কিছুদিন আসে তাও সবাই আসে না। এই মাদ্রাসায় ইবতেদায়িসহ ১০টি ক্লাসরুম থাকার কথা কিন্তু রুম আছে মাত্র পাঁচটি। ইবতেদায়ির কোনো কক্ষ নেই। শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থী না থাকলেও চারজন শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন নিয়মিত।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, মাদ্রাসাটি ১৯৮৩ সালে স্থাপিত হয়। শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ২১ জন। ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৭ জন।  ৯৬ জন উপবৃত্তি পায়। ২০২৩ সালে দাখিল পাস করেছে পাঁচজন, ২০২৪ সালে পাস করেছে তিনজন ও ২০২৫ সালে পাস করেছে চারজন। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর কমপক্ষে ১১ জন পাস করতে হবে। পর পর তিন বছর নির্ধারিত সংখ্যার কম পাস করলে শিক্ষকদের বেতনভাতা বন্ধ করার নিয়ম থাকলেও এ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা কার্যকরী হচ্ছে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খুব অবাক হই, যেখানে ছাত্রী  নেই বছরের পর পর সেখানে মাদ্রাসা চলে কী করে? ৮-১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী কোনো দিন দেখা যায়নি। শিক্ষকরাও ঠিকমতো আসে না। তাহলে শিক্ষকরা বেতন পায় কেমন করে। মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য অভিভাবক আকবর আলী বলেন, কমিটির সভায় খালি সই নেয়।  এখানে ছাত্রীর চেয়ে শিক্ষক বেশি ।

ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. আব্দুল গফ্ফার শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি এখানে নুতন যোগদান করেছি। চেষ্টা করছি উপস্থিতি বাড়ানোর। সে লক্ষ্যে হোম ভিজিট করছি। তবুও উপস্থিতি বাড়ানো যাচ্ছে না। এখানে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেশি। ইবতেদায়ি শাখার শিক্ষক আছে শিক্ষার্থী নেই এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, কক্ষ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি (সাবেক সুপার) মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি দু-এক দিন পর পর আসি এবং ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছি। শিক্ষকরা চেষ্টা করছেন। শিক্ষার্থী নেই, নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী দাখিল পাস করছে না, তবুও কেন বেতনভাতা  দিচ্ছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন বিল বন্ধ করার এখতিয়ার আমার নেই।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাজ্জাদ হেসেন বলেন, আমি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। এখনো সব প্রতিষ্ঠান দেখা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আরিফ বলেন, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটির সত্যতা পাওয়া গেলে বেতন বন্ধ করা হবে। কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।