মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা লাভ করা। দুনিয়ার সম্মান ক্ষণস্থায়ী হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা চিরস্থায়ী। তিনি যাদের ভালোবাসেন, তাদের নাম ফেরেশতাদের সামনে উচ্চারিত হয়। তাদের ইবাদত, ত্যাগ ও একান্ত সাধনা আল্লাহর দরবারে গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যারা রাতের নীরবতায় নিজের আরাম, ঘুম ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে তাহাজ্জুদ আদায়ের জন্য রবের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তাদের জীবন আল্লাহর কাছে অনন্য মর্যাদায় উন্নীত হয়। তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন আল্লাহ। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
আবুদ দারদা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণির মানুষকে মহান আল্লাহ মহব্বত করেন এবং তাদের ব্যাপারে আনন্দ প্রকাশ করেন। এ তিন শ্রেণির মধ্যে দুই শ্রেণিই হলো তাহাজ্জুদগুজার। এক শ্রেণির পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘যার রয়েছে সুন্দরী স্ত্রী এবং নরম বিছানা। কিন্তু সে নিজের চাহিদা পরিত্যাগ করে রাতের বেলা উঠে যায়, আমাকে স্মরণ করে, আমার সঙ্গে গোপন আলাপ করে। অথচ ইচ্ছে করলে সে ঘুমিয়ে থাকতে পারত।’ আরেক শ্রেণির পরিচয় এভাবে এসেছে, ‘ওই ব্যক্তি, যেকোনো সফরে আছে। তার সঙ্গে কাফেলা আছে। রাতে সফর করতে করতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সকলে নিন্দ্রায় গেছে। কিন্তু সে সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় শেষ রাতে জেগে ইবাদত করেছে।’ (বাইহাকি)
কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ সেসব বান্দার প্রশংসামূলক আলোচনা করেছেন, যারা রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে জেগে ওঠে নামাজ, দোয়া, জিকির ও ইসতেগফারে মগ্ন থাকে। মুত্তাকি বান্দাদের প্রশংসা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুত্তাকিরা অবশ্যই উদ্যানরাজি ও প্রস্রবণগুলোর মাঝে থাকবে। তারা উপভোগ করতে থাকবে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে, যা কিছু দেবেন। পার্থিব জীবনে তারা ছিল সৎকর্মশীল। তারা রাতের অল্প সময়ই নিন্দ্রায় অতিবাহিত করত এবং তারা সাহরির সময় ইসতেগফারে রত থাকত। (সুরা জারিআত ১৫-১৮)
অন্যত্র রাতের বিভিন্ন প্রহরে ইবাদতকারী বান্দাদের প্রশংসা করা হয়েছে এভাবে, ‘তবে কি (এরূপ ব্যক্তি সেই ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে,) যে আখেরাতকে ভয় করে এবং নিজ প্রতিপালকের রহমতের আশা করে রাতের মুহূর্তগুলোতে ইবাদত করে, কখনো সেজদাবস্থায়, কখনো দাঁড়িয়ে? বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে কি সমান?
(সুরা জুমার ৯)
বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, আল্লাহ বান্দাকে ভালোবাসবেন, এটাই তো বান্দার হৃদয়ের প্রত্যাশা। যারা শেষ রাতে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তার ইবাদতে মশগুল থাকে, তারা মহান আল্লাহর ওলি হয়ে যান, আল্লাহ তাদের নিজ ভালোবাসায় সিক্ত করেন।
আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণির মানুষকে মহান আল্লাহ ভালোবাসেন। এরপর ওই তিন শ্রেণির বিবরণ দিয়েছেন। তাদের এক শ্রেণি হলেন, যারা রাতের শেষভাগে ইবাদত-বন্দেগি ও জিকির-তেলাওয়াতে মগ্ন থাকে, এমনকি সফর ও ক্লান্তির হালতেও। হাদিসের ভাষ্য হলো, ‘এক কাফেলা রাতভর সফর করেছে। সফর করতে করতে যখন দুনিয়ার সবকিছু থেকে ঘুম তাদের প্রিয় হয়ে উঠেছে, তখন যাত্রাবিরতি দিয়েছে এবং (বিছানায়) মাথা রেখেছে। এ অবস্থায় তাদের একজন নামাজে দাঁড়িয়ে আমার কাছে অনুনয়-বিনয় করছে এবং আমার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করছে। (মুসনাদে আহমাদ)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমাদের রব মহান আল্লাহ দুই ব্যক্তির প্রতি অত্যন্ত খুশি হন। তার মধ্যে একজন হলো ওই ব্যক্তি, যে লেপ ও বিছানা ছেড়ে নিজের প্রিয়মানুষ ও পরিবারের মাঝ থেকে (শেষ রাতে) নামাজের জন্য উঠে যায়। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের ডাক দিয়ে বলেন, হে আমার ফেরেশতারা! আমার এ বান্দার প্রতি লক্ষ করো। সে লেপ ও বিছানা ছেড়ে নিজের প্রিয়মানুষ ও পরিবারের মাঝ থেকে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে, আমার নেয়ামতের আশায় এবং আমার আজাবের ভয়ে। (মুসনাদে আহমাদ)
শেষ রাত দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত। এ মুহূর্তে মহান আল্লাহ বান্দার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করেন। বান্দা যে দোয়া করে তা কবুল করেন। আমর ইবনে আবাসা (রা.) বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! বিশেষ কোনো দোয়া বা বিশেষ কোনো সময় আছে কি, যা মহান আল্লাহর কাছে অন্য দোয়া ও অন্য সময় থেকে অধিক প্রিয়? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অবশ্যই আছে। মহান আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় রাতের শেষ প্রহরে। সুতরাং ওই সময় যারা আল্লাহর জিকির করে, সম্ভব হলে তাদের মধ্যে তুমিও শামিল হয়ে যাও। (তিরমিজি)
রাতের শেষ প্রহর কল্যাণের আধার। এ সময় উন্মুক্ত হয় মহান আল্লাহর দয়া ও দানের প্রশস্ত দুয়ার। মহান আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের সাগরে যেন জোয়ার আসে। তিনি বান্দার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন। বান্দাকে দান করার জন্য, বান্দার গুনাহ মাফ করার জন্য এবং বান্দার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য ডাকতে থাকেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের রব মহান আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ, আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ, আমার কাছে (কিছু) চাইবে, আমি তাকে দান করব। কে আছ, আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। (সহিহ বুখারি) সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, মহান আল্লাহ এভাবে ঘোষণা করতে থাকেন সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত।
যুগে যুগে যারা মহান আল্লাহকে মহব্বত করেছেন, আল্লাহর ওলি হয়েছেন, তাহাজ্জুদ ও শেষ রাতের জিকির-ইসতেগফার ছিল তাদের একটি প্রিয় আমল। এমনকি পূর্ববর্তী উম্মতের যারা নেককার বান্দা ছিলেন তারাও কিয়ামুল লাইলের প্রতি বেশ যতœবান ছিলেন। কারণ এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর পরম নৈকট্য লাভ হয়, গুনাহ মাফ হয় এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা অবশ্যই তাহাজ্জুদ আদায় করবে। কেননা, তাহাজ্জুদ ছিল পূর্ববর্তী নেককারদের অভ্যাস। এ নামাজ তোমাদের আপন রবের নৈকট্য দান করে, তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে এবং তোমাদেরকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে। (সহিহ ইবনে খুজায়মা)
জান্নাতে বিশেষ ধরনের কক্ষ আছে, সেগুলো এত জাঁকজমকপূর্ণ এবং এমন স্বচ্ছ যে, এর ভেতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভেতর দেখা যাবে। যারা এই অসাধারণ কামরার অধিকারী হবে, তাদের একটি গুণ হচ্ছে, তারা তাহাজ্জুদ আদায়কারী হবেন। আবু মালেক আশআরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একটি কক্ষ আছে, যার বাহির থেকে ভেতর এবং ভেতর থেকে বাহির দেখা যাবে। এই কামরাটি মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তুত করেছেন, যারা মানুষকে খাবার খাওয়ায়, কোমল স্বরে কথা বলে, বেশি বেশি রোজা রাখে এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজে দণ্ডায়মান হয়। (মুসনাদে আহমাদ)
হাসসান ইবনে আতিয়্যা (রহ.) বলেন, আমাদের নিকট এই হাদিস পৌঁছেছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রাতের গভীরে দুই রাকাত নামাজ দুনিয়া এবং দুনিয়াতে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম। আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে আমি তাদের ওপর শেষ রাতের দুই রাকাত নামাজ ফরজ করে দিতাম। (আজ-জুহ্দ ওয়ার রাকাইক) মহান আল্লাহ আমাদের নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার