বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি 

মানদণ্ড ও সক্ষমতার প্রশ্নই মুখ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএইচডি ডিগ্রির মূল উদ্দেশ্যই হলো-  নিজের জানার পরিধি কতটা ছোট তা বুঝতে পারা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মান, শিখন পদ্ধতি, গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন আছে বহুবিধ। যত ওপরের স্তরের দিকে যাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে ততই দেখা যায় বিষাদের ছায়া। পিএইচডি শুধু ডিগ্রি নয়, এ হলো গবেষণালব্ধ অর্জন ও বিকাশের গভীর অধ্যায়। দুঃখজনক কিন্তু অসত্য নয়, এই পিএইচডির ক্ষেত্রেও চোর্যবৃত্তির অভিযোগ নানা সময়ে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো গবেষণাকেন্দ্র অর্থাৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা কিংবা মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি ডিগ্রি চালুর অনুমতি দেওয়ার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভাবনা কতটা যথাযথ তা আবার সংযোজন করেছে নতুন প্রশ্ন। ১৯ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘গবেষণা নাকি বাণিজ্য’ শিরোনামযুক্ত জিজ্ঞাসাসূচক শীর্ষ প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে ইউজিসি। ইউজিসি সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একসঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা যাচাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পিএইচডি চালুর জন্য যোগ্যতা ও সক্ষমতার মানদণ্ড নির্ধারণে ইউজিসি কাজ করছে। আমরা জানি, সত্যিকার অর্থে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য শুধু একজন শিক্ষা গবেষক ও একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিবিড় গবেষণার পরিবেশ, সুদক্ষ তত্ত্বাবধান, যথাযথ  অর্থায়ন, অবকাঠামোসহ মান নিশ্চিতকরণ। আমরা মনে করি, পিএইচডি শুধু বর্ধিত আরেকটি ডিগ্রি অর্জনই নয়। একজন পিএইচডি গবেষক কিংবা অর্জনকারীর নিবিড় গবেষণা, গবেষণার বিশ্লেষণের কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে হয়, যা থিসিস পেপার হিসেবে গণ্য। গবেষণার নৈতিকতা রক্ষা আরও একটি জরুরি বিষয়। এ ক্ষেত্রে একাডেমিক পরীক্ষা কিংবা গবেষণা যার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় অর্থাৎ সেই তত্ত্বাবধায়কের দক্ষতাও হওয়া জরুরি সেই পর্যায়ে। এ ক্ষেত্রে মৌলিকত্বের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ববহ। গবেষকের মৌলিকত্ব-বিশ্লেষণ দক্ষতার বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে পিএইচডি অর্জনের বিষয়টি যতটা মর্যাদার, ততটাই স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে গবেষণার ব্যয়সহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই এই পথপরিক্রমার অনুষঙ্গ।

মানদণ্ড, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, পরিবেশ-পরিস্থিতি এসবের নিশ্চিতকরণের বিষয়গুলো এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। দেশের অনেক শিক্ষাবিদই এ ব্যাপারে ইউজিসির ভাবনা নিয়ে শুধু মানের সংশয়ই প্রকাশ করেননি, তারা একই সঙ্গে আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপসহ নানামুখী সমস্যার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন আমরা এর সঙ্গে সহমত পোষণ করি। উচ্চশিক্ষার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘সনদ বাণিজ্য’র অনাচার-কদাচারের অনেক নজিরই আমাদের সামনে আছে। এর ঢেউ অনেক ক্ষেত্রে নিচের স্তরেও অভিঘাত করছে। এমতাবস্থায় কি উচ্চ সনদ বাণিজ্যে’র নতুন কোনো পথ উন্মোচিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায়? আমরা স্বীকার করি, দেশে বেসরকারি উচ্চমানসম্মত কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু সেগুলো শনাক্তকরণসহ মান নিয়ন্ত্রণের জন্য যে আবশ্যকতা দরকার তার জন্য ইউজিসির প্রস্তুতি কতটা আছে? পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের দীর্ঘ জার্নিতে একজন তুখোড় মেধাবীকে অনুশীলন ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতিফলন ঘটিয়েই অর্জন করতে হয় স্বীকৃতি।

আমরা মনে করি- এ ব্যাপারে ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আরও গভীরভাবে ভাবা বাঞ্ছনীয়। অনস্বীকার্য্য যে,  দেশে আরও যোগ্য শিক্ষক বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খুব দরকার এবং এ জন্য পিএইচডি,পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পিএইচডিধারী শিক্ষকরা। এ জন্য বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, মানের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই। সবার আগে জরুরি দক্ষতা-যোগ্যতা-মানদ- নিশ্চিত করা। আমরা জানি- পিএইচডি, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নয়- নৈতিকতা এ ক্ষেত্রে আরও অগ্রগণ্য।