১৩৫ বছরে সেপ্টেম্বরে উপকূলে ৩ ঘূর্ণিঝড়!

সেপ্টেম্বর মাস বঙ্গোপসাগরের উপকূলবাসীর জন্য নিরাপদই বলা চলে। ১৩৫ বছরের ইতিহাসে বছরের এই সময়ে ৪৩টি ঘূর্ণিঝড় হলেও মাত্র তিনটির গতিপথ ছিল বাংলাদেশ উপকূলের দিকে। এই তিনটি ছিল ১৯১৭, ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালে। বাকি ৪০টি আঘাত হেনেছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূলের দিকে। এবারও একই গতিপথে এগুবে সৃষ্টি হতে যাওয়া লঘুচাপটি। এমনটাই ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা।

বর্তমানে দেশের আবহাওয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেপ্টেম্বরের বঙ্গোপসাগর নিয়ে দেশের উপকূলবাসীকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। এর অন্যতম কারণ, বছরের এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে কোনো লঘুচাপ, সুস্পষ্ট লঘুুচাপ কিংবা নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে সেগুলোর গতিপথ বাংলাদেশ উপকূলের দিকে আসে না। এগুলোর বেশিরভাগের গন্তব্য থাকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার দিকে।

উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ১৯১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টি খুলনা উপকূলে, ১৯৬৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরেরটি হাতিয়া উপকূলে এবং ১৯৯৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের ঝড়টি চট্টগ্রাম হয়ে মিয়ানমার উপকূলে আঘাত করেছিল। যদিও এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে ৪৩টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল।

সেপ্টেম্বরের ঘূর্ণিঝড় কেন বাংলাদেশে আসে না : ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে মৌসুমি বায়ু ফিরে আসা শুরু হয় ২০ সেপ্টেম্বর থেকে। এই বায়ু দিল্লি, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, ঢাকা হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে ভারত মহাসাগরে ফিরে যায় মধ্য অক্টোবরে। এর পরপরই দেশে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম শুরু হয়। এ বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার আগে মূলত দেশে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে না। আর এ সময়ে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার রেকর্ডও নগণ্য। যেগুলো সৃষ্টি হয় সেগুলোও বাংলাদেশ উপকূলের দিকে আসে না।’

বাংলাদেশ উপকূলের দিকে কেন আসে না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মৌসুমি বায়ু উত্তর দিক থেকে সাগরের দিকে ধাক্কা দেয়। এই ধাক্কা খেয়ে সাগরের নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলের দিকে আসতে না পেরে মিয়ানমার উপকূলের দিকে কিংবা ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলের দিকে আঘাত করে।

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ঝড়গুলো বাংলাদেশ উপকূলের দিকে কম আসার জন্য মৌসুমি বায়ুর বিদায়কে দায়ী করে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, মৌসুমি বায়ু বিদায় নিয়ে থাকে অক্টোবরের মাঝামাঝিতে। এর একটি প্রভাব সাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের ওপর থাকে। ফলে মৌসুমি বায়ু বিদায়ের পরপর ঘূর্ণিঝড়গুলো আমাদের উপকূলের দিকে আসে না। তবে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে যেগুলো সৃষ্টি হবে সেগুলো বাংলাদেশ উপকূলে আসার সম্ভাবনা থাকে।

ঘূর্ণিঝড় কখন সৃষ্টি হয় : সাগরের তাপমাত্রা একটানা বৃদ্ধি অবস্থায় থাকা ও বায়ুপ্রবাহের গতিবেগ বৃদ্ধিসহ আরও কিছু কারণে সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সাগরের উপরের পৃষ্ঠের একটানা তাপমাত্রা যদি ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস  থেকে ৩০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে এবং সেই সঙ্গে বাতাসের গতিবেগসহ আরও কিছু অনুকূল পরিবেশ পায় তখন সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। সেই লঘুচাপের পর অনুকূল পরিবেশ থাকলে তা সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়। গভীর নিম্নচাপের পরের ধাপ হলো ঘূর্ণিঝড়।

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির উল্লেখ্যযোগ্য সময় হলো প্রাক-বর্ষা মৌসুম (এপ্রিল-মে) ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুম (অক্টোবর-নভেম্বর)। প্রাক-বর্ষা মৌসুমে গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার পর বর্ষা শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তের সময়টি ঘূর্ণিঝড়ের উর্বর সময়। এ ছাড়া বর্ষার শেষে মৌসুমি বায়ু বিদায়ের পর এবং শীতকাল শুরু হওয়ার আগের সময়টিও বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য সময়।

উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে এই দুই সময়েই শুধু শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলে আঘাত করেছিল। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় কিন্তু গিয়েছিল ভোলার ওপর দিয়ে। এ ছাড়া ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বরের ‘সিডর’ আঘাত করেছিল বরগুনার ওপর দিয়ে। ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আঘাত করেছিল ভোলায়। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত করেছিল খুলনায় এবং ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবরের ‘তিতলি’ আবার ওড়িশার ভুবনেশ্বরে আঘাত করেছিল। অন্যদিকে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম অঞ্চলের ওপর দিয়ে আঘাত করেছিল, ২০০৭ সালের ১৪ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আকাশ’ চট্টগ্রাম অঞ্চলে, ২০০৯ সালের ২৭ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ খুলনা উপকূলে, ২১ মে ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ চট্টগ্রাম অঞ্চলে ও ২০১৭ সালের ২৯ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ টেকনাফ উপকূলে আঘাত করে। এভাবে দুই মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করে আসছে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপ কিংবা নিম্নচাপগুলো মৌসুমি নিম্নচাপ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।