বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শান্তিতে বাঁচতে চায়। চায় নিরাপদ জীবন, সুন্দর সমাজ ও পারস্পরিক সম্প্রীতি। কিন্তু সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অন্যায়ের কারণে সেই প্রত্যাশা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা। ইসলাম এসব গুণের শিক্ষা দেয়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়। বিশ্বমানবতার কল্যাণে ইসলামের এই শান্তির শিক্ষা আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলাম সেই মহৎ আদর্শ, যা মানুষকে সত্যিকারের শান্তি ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে। ‘ইসলাম’ শব্দটির মধ্যেই নিহিত আছে শান্তির বার্তা। আরবি ‘সালাম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ, নিরাপত্তা ও শান্তি। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তার নির্দেশ অনুসরণই মানুষকে শান্তির প্রকৃত স্বাদ উপহার দিতে সক্ষম।

ইসলামের মৌলিক দর্শন হলো ন্যায়, দয়া ও মানবকল্যাণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহ ন্যায়, উত্তম কাজ এবং আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন আর অশ্লীলতা, মন্দ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা নাহল ৯০) এ আয়াত ইসলামি শান্তির মর্মকথা স্পষ্ট করে। ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিশা দিয়েছে।

প্রথমত, ব্যক্তিগত জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা। মানুষের হৃদয় যদি ইমান ও তাকওয়ার আলোয় আলোকিত না হয়, তবে সে কোনোদিন শান্তি পাবে না। দুনিয়ার ধনসম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা ভোগ-বিলাস সাময়িক আনন্দ দিলেও তা প্রকৃত প্রশান্তি দিতে পারে না। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ ২৮) ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠ করে, মনকে হিংসা, লোভ, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করে। এভাবে ব্যক্তির অন্তরেই প্রকৃত শান্তি জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, পারিবারিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা। পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। ইসলাম পারিবারিক জীবনে ন্যায়, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছে। দাম্পত্য সম্পর্ককে শান্তি ও মমতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম ২১) এভাবেই ইসলাম পরিবারকে শান্তির ঘর বানাতে চায়, যা সামাজিক শান্তির জন্য অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, সামাজিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা। ইসলাম ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের শিক্ষা দেয়। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পরের ভাই।’ (সুরা হুজুরাত ১০) সামাজিক জীবনে হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়-অবিচার দূর করার জন্য ইসলাম কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে। একদিকে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, সুদ, প্রতারণা, ঘুষ, চুরি ও ডাকাতিকে হারাম করা হয়েছে; অন্যদিকে পরস্পরের সহায়তা, দান-খয়রাত, সৎকর্মে সহযোগিতা এবং মানবসেবাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সমাজে যদি পারস্পরিক ভালোবাসা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত ন্যায়, সমতা ও কল্যাণভিত্তিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেখানে মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং নানা গোত্রের মানুষ বসবাস করত। তিনি সবার সঙ্গে মদিনা সনদ সম্পাদন করেন, যেখানে প্রত্যেককে তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এ সনদ বিশ্বের ইতিহাসে মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রথম দলিল হিসেবে স্বীকৃত। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসক জনগণের সেবক, জনগণ শাসকের নয়। অন্যায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিপীড়নের কোনো স্থান সেখানে নেই।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি প্রতিষ্ঠা। ইসলাম বিশ্ব মানবতার ঐক্য ও শান্তিকে গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি পুরুষ ও নারী থেকে এবং বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই, যে সবচেয়ে পরহেজগার।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

ইসলাম এখানে জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সংঘাতের কারণ নয়, বরং পারস্পরিক পরিচিতি ও সৌহার্দ্যরে মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

ইসলাম যুদ্ধকে সীমিত পরিস্থিতিতে অনুমোদন দিয়েছে শুধু আত্মরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। আক্রমণাত্মক যুদ্ধ, দখল ও নিপীড়ন ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর পথে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা বাকারা ১৯০) আবার অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যদি তারা সন্ধির আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সন্ধির জন্য আগ্রহী হও এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আনফাল ৬১) এ থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলাম সর্বপ্রথম শান্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যুদ্ধকে নয়।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের ইতিহাস বিশ্বশান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরপুর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা বিজয়ের ঘটনাই তার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি মক্কার মুশরিকদের ওপর বিজয় লাভ করার পর প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এভাবেই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রকৃত শক্তি প্রতিহিংসায় নয়, বরং ক্ষমা ও শান্তিতে নিহিত।

আধুনিক বিশ্বে ইসলামের শান্তির শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজনীয়। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি যতই হোক না কেন, যদি তা ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে স্থায়ী শান্তি আসবে না। ইসলাম সেই ন্যায় ও সততার শিক্ষা দিয়েছে, যা সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতি, দেশ বা সম্প্রদায়ের ধর্ম নয়, বরং সর্বজনীন মানবতার ধর্ম। তার শান্তির বার্তা সীমান্ত অতিক্রম করে গোটা বিশ্বকে আচ্ছাদিত করে।

আজকের বিশ্বে দেখা যায়, কেউ কেউ ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে ন্যায়সংগত করার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম এ ধরনের চরমপন্থাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। নিরীহ মানুষ হত্যা ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজনকে বাঁচাল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচাল।’ (সুরা মায়েদা ৩২) এ আয়াত প্রমাণ করে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের মর্যাদা অপরিসীম। তাই ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও রক্তপাত মূলত ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বিরোধী।

অতএব বলা যায়, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা প্রদান করেছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায়, ভালোবাসা, দয়া ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দিয়েছে। যদি মানবজাতি সত্যিই এ শিক্ষা গ্রহণ করে, তবে পৃথিবী রূপান্তরিত হবে শান্তির বাগানে। মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আসবে, সমাজে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্বে সৌহার্দ্য ও সহাবস্থান নিশ্চিত হবে।

শেষ পর্যন্ত এটা উপলব্ধি করা জরুরি যে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা কোনো কূটনৈতিক সেøাগান বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন মানুষে মানুষে আন্তরিক ভালোবাসা, ন্যায়বিচারের পূর্ণ প্রয়োগ এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ। ইসলামই সেই জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে এসব গুণে সমৃদ্ধ করে এবং প্রকৃত শান্তির দিকে নিয়ে যায়।

আসুন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের সেই নীতিমালা গ্রহণ করি, যে নীতিমালা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য নিয়ে এসেছেন। তাহলে আশা করা যায়, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ আমাদের শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবেন।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার