অশান্তির আগুনে পুড়ছে বিশ্ব

রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা পাওয়ার কথা একজন নাগরিকের। কিন্তু বিশ্বের বহু মানুষের বাস্তবতা এর বিপরীত। কোথাও খাদ্য ও পানির সংকট, কোথাও কাজের অভাব, কোথাও রাজনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা, আবার কোথাও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঘর হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন অসংখ্য মানুষ। নানামুখী চাপে বিশ্ব এখন পুড়ছে অশান্তির আগুনে।

শান্তি কখনো নিজে আসে না। শান্তি গড়ে তুলতে হয় সচেতন উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এটি একদিনের কাজ নয় বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিদিনের দায়িত্ব। বৈষম্য কমিয়ে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং সংলাপের পথ খোলা রেখে শান্তির ভিত্তি শক্ত করতে হয়। এ অবস্থায় বিশে^ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস।

আজ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্যশান্তিতে বিনিয়োগ : সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন।

দিবসটি উপলক্ষে এক বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করতে হবে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষায়। মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। বিভাজন দূর করে সবার কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনীতি, সংলাপ, আলোচনা ও শান্তিরক্ষার মতো পরীক্ষিত পদ্ধতিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।

সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সংঘাত পরিস্থিতির সাম্প্রতিক চিত্র উদ্বেগজনক। গেল ২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৯টি দেশে সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। সিপ্রির হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা সিপ্রির নথিভুক্ত ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বেসামরিক মানুষ চড়া মূল্য দিচ্ছে : সংঘাতের কারণে বিশ্ব শান্তি নষ্টের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দিতে হচ্ছে সবচেয়ে বড় মূল্য। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের এসডিজি-১৬ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংঘাতসম্পর্কিত ঘটনায় ৪৮ হাজার ১১ জন বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এর আগের বছর প্রাণহাণি ঘটে ৩৭ হাজার ১৬৩ জনের।

নিহতদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন শিশু এবং প্রতি চারজনে একজন নারী ছিলেন। তবে এই পরিসংখ্যানও পুরো চিত্র নয়। তথ্য বলছে, ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক ৪১ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র অস্ত্র ২০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। অর্থাৎ যুদ্ধের হিসাব শুধু নিহতের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আহত, পরিবারহারা শিশু, ধ্বংস হওয়া স্কুল ও হাসপাতাল, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা, মানসিক আঘাত এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা অনিশ্চয়তাও শান্তি নষ্টের একটি কারণ।

মানবাধিকারের সংকট : জাতিসংঘের ২০২৬ সালের এসডিজি-১৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন ও নীতিগত কাঠামোর ক্ষেত্রে মানবাধিকারের অগ্রগতি হলেও বাস্তবে তা সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার ৩০৭জন মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও ট্রেড ইউনিয়নকর্মী নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ১০ ঘণ্টায় একজন মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক বা ট্রেড ইউনিয়নকর্মী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। মানবাধিকার রক্ষাকারীদের নিরাপত্তা সংকট শান্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ যেখানে মতপ্রকাশ, সংগঠন, তথ্যপ্রাপ্তি বা ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত, সেখানে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে। আর আস্থার সংকট সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করে। জাতিসংঘের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, দুর্বল জবাবদিহি, অসম রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আইনের শাসনের ঘাটতি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা।

আশ্রয় হারিয়েছে পৌনে ১২ কোটি মানুষ : সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি বড় পরিণতি বাস্তুচ্যুতি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ। এর পেছনে রয়েছে নিপীড়ন, সংঘাত, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিশ্বব্যাংক বলছে, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি জটিল সংকট তৈরি করছে।

দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ফাঁদ : বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত অর্থনীতিগুলোতে চরম দারিদ্র্য দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে সংঘাত বা অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত প্রতিদিন ৩ ডলারের কম আয় দিয়ে জীবনযাপনকারী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪২ কোটি ১০ লাখ। ২০৩০ সালে এ সংখ্যা প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের চরম দরিদ্র মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ সংঘাত শুধু মানুষ হত্যা করে না, অর্থনীতিকেও দুর্বল করে, কর্মসংস্থান কমায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে দেয় এবং দারিদ্র্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

জলবায়ু সংকটও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি : জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি সব সংঘাতের কারণ নয়। তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান দারিদ্র্য, দুর্বল শাসন, খাদ্য ও পানির সংকট এবং জীবিকার অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, জীবিকা হারানো, দুর্যোগ, পানির চাপ ও বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ মানুষের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়াতে পারে। আবার সংঘাতপ্রবণ দেশগুলো জলবায়ু ঝুঁকিতেও বেশি থাকে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২৫টি দেশের মধ্যে ১৭টি দেশই সংঘাত ও ভঙ্গুরতায় আক্রান্ত। ফলে জলবায়ু সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে খাদ্য, পানি, জীবিকা, অভিবাসন ও মানবনিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ থামানো নয় : শান্তি মানে শুধু বন্দুকের শব্দ থেমে যাওয়া নয়। শান্তি মানে মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার, কাজের সুযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা। ইউনিসেফ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রেক্ষাপটে বলছে, শিশুদের জন্য শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ না থাকা নয়, নিরাপত্তা, মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবায় সমান সুযোগ পাওয়াও শান্তির অংশ। সুতরাং একটি রাষ্ট্রে সংঘাত না থাকলেও যদি মানুষ বৈষম্য, নিপীড়ন, ভয়, অনিরাপত্তা বা অধিকারহীনতার মধ্যে থাকে, তাহলে সেই শান্তি কতটা টেকসই সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন : শান্তির প্রথম বিনিয়োগগুলোর একটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু মতপার্থক্য যখন সংলাপের পরিবর্তে সংঘাতের দিকে যায়, তখন শান্তির পরিবেশ দুর্বল হয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা বলতে বোঝায়-বিরোধী মতকে জায়গা দেওয়া, সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার বদলে আলোচনার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থনৈতিক বৈষম্যও শান্তির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ : বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে সামাজিক বঞ্চনা, সুযোগের ঘাটতি ও বৈষম্যকে ভঙ্গুরতা, সংঘাত ও সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘাত আবার অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেধ্বংস করে অবকাঠামো, কমিয়ে দেয় কর্মসংস্থান, বাধাগ্রস্ত করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং বাড়িয়ে দেয় দারিদ্র্য।

মানুষ যদি মনে করে তার কথা শোনা হয় না, আইনের প্রয়োগ সমান নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো অংশগ্রহণ নেই, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে। আর আস্থার জায়গা দুর্বল হলে সংলাপের জায়গাও সংকুচিত হয়। তখন ছোট সামাজিক বিরোধও বড় রাজনৈতিক বা সহিংস সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্তার তাৎপর্য শুধু যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শান্তিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই বিনিয়োগের অর্থ মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয়, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি, মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা, মানুষের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও সংলাপের পথ খোলা রাখা।