অপরাধীর দাপটে নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা

হঠাৎ টালমাটাল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রতিদিনই ঘটছে হত্যাকা- থেকে শুরু করে নানা অপরাধ। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ পাচ্ছেন না রেহাই। রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও হত্যাকান্ড ঘটছে। তুচ্ছ ঘটনায় বাবা বা মা তার আদরের সন্তানকে মেরে নিজেও আত্মহত্যা করছেন। রাস্তায় নামলে ছিনতাইকারীদের ভয়ে কাবু পথচারীরা। আবার পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকারও হচ্ছেন অনেকেই। চাঁদাবাজির ঘটনাও নেই পিছিয়ে। বিদেশ থেকে শীর্ষ অপরাধীরা তাদের অনুসারীদের দিয়ে অপরাধ সংঘটিত করছে। সর্বশেষ কুমিল্লায় শিক্ষার্থী অপ্রতিম ও খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আজমুল হোসেনকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে যোগ হয়েছে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুনের ঘটনা। সব মিলিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অনেকটা চাপে পড়েছে পুলিশ। এই নিয়ে শনিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বাসায় পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন। গতকালও পুলিশ সদর দপ্তরসহ সবকটি ইউনিটে হয়েছে একাধিক বৈঠক। অপরাধীদের নির্মূল করতে শিগগির বড় একটি অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। দাগি অপরাধীদের পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।  

সার্বিক বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রতিটি থানায় ২৪ ঘণ্টা পুুলিশের টহল বাড়াতে বলা হয়েছে। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত টহলেই থাকতে হবে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা দলটির অঙ্গ-সংগঠন কোনো ধরনের মিছিলসহ অন্য অপকর্ম চালালেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, পুলিশের টহল বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। থানায় জনবল বা যানবাহন সংকট থাকলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। কিশোর বা শিশু গ্যাং বলে কিছু থাকবে না। সবকিছুই নির্মূল করা হবে।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জনমনে : পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক অপরাধের সব সূচক যে ঊর্ধ্বমুখী বিষয়টি এমন নয়। বরং চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো কয়েকটি অপরাধ কমেছে। কিন্তু একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা এবং গণপিটুনির মতো গুরুতর অপরাধের কিছু সূচক বেড়েছে। কুমিল্লায় বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে গত শুক্রবার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। পরদিন শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ ও পরিবার। মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে জানায় পুলিশ।

এদিকে খুলনায় ভাত চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় খুবি ছাত্র আজমুল হোসেনকে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও দেশে নিরাপত্তার উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকেই সামনে আনছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৪ হাজার ৬০২টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় নিহত হয়েছে ২৫৪ শিশু। সে হিসাবে গড়ে দৈনিক একজনের বেশি শিশু সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়া জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক : অপরাধ রোধে গত শনিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বাসায় বৈঠক করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে। তাছাড়া গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরেও হয়েছে আরেকটি বিশেষ বৈঠক। বৈঠকগুলোতে বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হবে, সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এলাকায় থানা পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন তারা।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও চরমপন্থিদের তৎপরতা : পুলিশের তথ্যানুযায়ী আন্ডারওয়ার্ল্ড আগের চেয়ে বেশি তৎপর হচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ছে। টার্গেট কিলিং হচ্ছে। চরমপন্থিদেরও অপকর্ম বেড়ে গেছে। দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশ থেকে হত্যার নির্দেশনা আসছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও আছে আতঙ্ক। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার নির্দেশ দিলেও পুলিশের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে না লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র। ধরা পড়ছে না দাগি অপরাধী। প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

বড় ঝুঁকিতে ছোট শিশুরা : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি-আগস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় নিহত ২৫৪ শিশুর প্রায় ৪৩ শতাংশই ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী। শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু রয়েছে মোট নিহতের প্রায় ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি একেবারে ছোট শিশুরাও সহিংসতার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পাবনা সদরে নিখোঁজের সাত দিন পর কামরুন্নাহার কলি নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত সোমবার বাগেরহাটের শরণখোলার দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রামে নিখোঁজের তিন দিন পর খাল থেকে শিশু রাফি আকনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। জামালপুরের মাদারগঞ্জে নিখোঁজের তিন দিন পর শনিবার রাতে মরিয়ম আক্তার নামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়মনসিংহের নান্দাইলে ডেকে নিয়ে ৭ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে দুবৃর্ত্তরা। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ফারজানা সুলতানা নামে এক শিশু শিক্ষার্থীর মরদেহ বিদ্যালয়ের পাশের এক বাড়ির আলমারি থেকে উদ্ধার করা হয়।

জানতে চাইলে আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ৮ মাসে ১৪ হাজার ৬০২টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ২৫৪ শিশু নিহত হওয়ার তথ্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। শিশুরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই ঝুঁকিতে থাকা নারী-শিশুর পাশে পরিবার ও সমাজকে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ছিনতাই বেড়েই চলেছে : ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই বেড়েই চলছে। দিনের বেলায়ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন মানুষ। ছিনতাই আতঙ্কে থাকেন পথচারীরা। ভোর ও রাতে কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত আলো, নজরদারি ও টহলের ঘাটতিও অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আবার গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন গেলেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবার পুরনো অপরাধে জড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা। বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা এবং নির্জন ফ্লাইওভারগুলোতে অপরাধীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। দূরপাল্লার নৈশকোচ থেকে নামা যাত্রীরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

পারিবারিক কলহে বলির শিকার শিশুরা : পারিবারিক বিরোধের বলির শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। বাবা কিংবা মা তাদের প্রিয় সন্তানদের হত্যা করছে। শনিবার সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তিন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে শিশুদের বিষ খাওয়ানোর পর বাবা নিজেও বিষপান করেন। গতকাল চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে পারিবারিক কলহের জেরে ১১ মাস বয়সের শিশুকন্যার মুখে বিষ ঢেলে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মা সোনিয়া খাতুনের বিরুদ্ধে। ১২ আগস্ট সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক কলহের জেরে নিজের ৬ বছরের ছেলে মুহাদ্দিস মিয়া ও সাড়ে ৩ বছরের কন্যা তুলনা আক্তারকে পানিতে ফেলে হত্যা করেছেন বাবা কামরুল হাসান।

মামলা বেড়েছে সারা দেশে : পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৪ হাজার ৬০২টি মামলা হয়। প্রতি মাসে গড়ে মামলা হয় ১৮২৫টি। এই সময়ে দেশে বিভিন্ন অপরাধে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। এর আগের ৬ মাসে এ সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ১২টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ১০ হাজার ৯৮০টি।

আসছে বিশেষ অভিযান : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য শিগগির বড় ধরনের বিশেষ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। বড় পরিসরে বিশেষ যৌথ অভিযান চালানো হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

শিশু নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আসকের উদ্বেগ : কুমিল্লার অপ্রতিমসহ সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং নির্যাতনের মতো ঘটনায় শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে আসক জানায়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে এসেছে। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু। তবে নিখোঁজের তথ্য পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ না হওয়ায় এই পরিসংখ্যানে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব উল্লেখ করে আসক নিখোঁজ হয়ে নিহত শিশুদের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।