রাহিদ ঘাড় উঁচু করে দেখল কাকটা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। একটু আগেও সে দেখেছে কাকটাকে, শান্ত হয়ে মরা গাছের শুকনা ডালে চুপচাপ বসে ছিল। মহাকাল এই কাককে চেনে, এটি সেই প্রাচীন ভূষণ্ডি কাক, ত্রিকালদর্শী কাক, পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী কাক, সেই সত্য যুগ থেকে যে প্রত্যক্ষ করেছে রক্তবৃষ্টি, পান করেছে যুদ্ধের রক্ত সেই দীর্ঘকালের অভিজ্ঞ কাক এই মুহূর্তে তাকে একা ফেলে কালো ডানা ঝাপটে হঠাৎ যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেল। রাহিদের হাতে একটা ভাঙা ছুরি, ছুরিটার ফলা নেই, তার হাতে শুধু ছুরির বাঁট। ফলার পুরোটাই গেঁথে আছে মিরাজের পিঠে, ঠিক গাঁথা নয়, আসলে পুরোটাই ঘ্যাঁচ করে ঢুকে গেছে ওর মাংশল পিঠের ভেতর, পিঠে রক্ত চুইয়ে পড়া সেই ছুরির ক্ষত নিয়ে মিরাজ এখন উপুড় হয়ে পড়ে আছে পথের ধুলায়। চারদিকে সুনসান নির্জন দুপুর। একটু দূরে বাজার। এটা বাজারে যাওয়ার পথ। আরেকটু পরে বিকেল হলেই বাজার বসবে, জায়গাটা গম গম করবে হাটুরেদের আনাগোনায়। রাহিদ তার মুঠোতে ধরে রাখা ছুরির বাঁটের দিকে তীব্র অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর ঘাড় নত করে দৃষ্টি নামিয়ে আনল নিচের দিকে, মিরাজ এভাবে কাটা গাছের গুঁড়ির মতো তার পায়ের কাছে নিষ্প্রাণ লুটিয়ে পড়ে আছে, এটাও অবিশ্বাস্য। এই জীবনে বহুবার সে মনে মনে মিরাজের পিঠে ছুরি মেরেছে, লাঠির আঘাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তার দুষ্টুমি ভরা মাথা, কিন্তু এবার কি সেই ইচ্ছা সত্যিকারেই পূর্ণ হলো? সজোরে একটা মাত্র ছুরিকাঘাত, তাকে সটান মাটিতে ফেলে দিল? রাহিদের একবার মনে হয়, মিরাজ বোধহয় বেঁচে থেকেও মরার ভান করছে, ছোটবেলার মতো মারা যাওয়ার অভিনয় করে তাকে ভয় দেখাচ্ছে। ফাজিলটা এক্ষুনি হো হো করে হাসতে হাসতে ধূলি ঝেড়ে উঠে দাঁড়াবে। পেটে খোঁচা দিয়ে বলবে, ‘কি ভাই, কেমন খেইল দেখাইলাম, বড্ড ঘাবড়ায়া গেছিলা নাকি..’
মিরাজের মাকে রাহিদ খালাম্মা বলে ডাকত। খালাম্মা বলতেন, ‘তোমরা দুইজন হইলা ভাই।’ মিরাজ আর রাহিদকে পাশাপাশি এক সঙ্গে খেতে বসিয়ে, মাংসের ঝোল বেড়ে দিতে দিতে বলতেন, ‘পৃথিবীর সব মানুষ ভাই ভাই। সবাই এক আদমের বংশধর। হাওয়া বিবি সকলের মা আর আদম সবার বাবা।’
রাহিদের মনে পড়ে, মাদ্রাসায় বড় হুজুর তাদের সুরা মায়িদাহর ২৭ নম্বর আয়াত পড়িয়েছিল। ‘ওয়াতে ইলাইহিম নাবা ইবনে আদম বিলহাক্ক... আর তুমি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা করো যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করল, তন্মধ্যে একজনের কোরবানি গৃহীত হলো আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে অবশ্য অবশ্যই হত্যা করব।’
রাহিদও তো কতদিন চিৎকার করে বলেছে, ‘তরে একদিন আমি নিজ হাতে খুন করুম মিরাজ! দেহিস!’
চোখ লাল করে, ভয়ানক ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে, মিরাজের বিচ্ছিরি সব ফাজলামোতে অতিষ্ঠ হয়ে, বিব্রত হয়ে, দুঃখিত হয়ে, লজ্জিত হয়ে এমনকি হাসতে হাসতেও গ্রামের অনেকের সামনে বহুবার রাহিদ এমন হুমকি দিয়েছে। সবাই এমন শাসানিকে ভেবেছে ফাঁপা আওয়াজ। অক্ষমের আস্ফালন। আকলিমার সামনেও হয়তো এমন ধমকানি দিয়েছে সে! বড় মামার মেজো মেয়ে বাদামি চোখের মায়াবিনী আকলিমা। মিরাজ তার স্বভাবমতো হো হো করে হেসে এসব হুমকি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছে। রাগের বশে অন্ধ মানুষ তো কত কিছুই বলে, সব বলা কি আর সত্য হয়? রাগ কমে গেলে মানুষ তো সেসব কথা ভুলেই যায়।
কাকটা আবার ফিরে এসেছে। দূরের রাস্তায় দুজন মানুষের ছায়া দেখা যাচ্ছে, তারা বাজারের দিকেই আসছে। কাকটা কর্কশ কণ্ঠে ডেকে ওঠে, ‘কা কা’। রাহিদ শুনল, ‘পালিয়ে যা, পালিয়ে যা।’ হাতে ধরা ছুরির বাঁটের দিকে এক নজর তাকিয়ে সেটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল সে। একপলক তাকাল মিরাজের দিকে। মিরাজকে মনে হচ্ছে ভুল করে পথের ওপর ঘুমিয়ে পড়া অবোধ শিশু। ঘুমাক! শান্ত ঘুমন্ত মিরাজকে অনন্ত প্রান্তরে একা ফেলে রেখে কাকের আদেশ মতো রাহিদ হন হন করে পা চালিয়ে হাঁটতে থাকে, পলায়নপর মানুষের মতোই পেছন দিকে একবারও না তাকিয়ে দ্রুত বড় বড় পা ফেলে পথের বাঁকে হারিয়ে যায় সে। বাজার অভিমুখী মানুষ দুটো এতক্ষণে মিরাজের পড়ে থাকা মৃতদেহটি আবিষ্কার করে ফেলেছে। বাজারগামী আরও লোক এসে জড়ো হলে লাশটি ঘিরে বেশ একটা জটলা ও গুঞ্জন তৈরি হয়। গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশিক্ষণ লাগে না।
আকলিমা তাদের বাড়ির খোলা উঠানে বসে ছোট বোনের চুলে তেল লাগিয়ে দশ আঙুলে মাথায় বিলি কেটে উঁকুন আছে কিনা দেখছিল। দুপুরের রোদ মরে গিয়ে দাউদপুর গ্রামে তখন একটা কোমল বিকাল নামছিল। উঠানের পাশে বেলগাছে বসে থাকা কাকটাপাতার আড়াল থেকে হঠাৎ ডাকল, ‘কা কা।’
আর তখনই গ্রামের কয়েকটা ছেলে বাজারের দিকে ধুপধাপ পা ফেলে দৌড়ে যেতে যেতে উচ্চকণ্ঠে বলে গেল, ‘মিরাজ ভাইরে মাইরা লাইছে গো! ছুরি দিয়া কোপ মারছে!’
আকলিমার বুকের ভেতর ধ্বক করে একটা শব্দ হয়, যেন হৃদপিণ্ডটা কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খায়,বোনের মাথায় রাখা তার হাত দুটো লোহার মতো ভারি হয়ে জমে যায়। বোন তার মাথা থেকে আকলিমার শক্ত হাত সরিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে, ছেলেদের পেছন পেছন দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে জানতে চায়, ‘কিরে ? ওই, কে মারছে মিরাজ ভাইরে?’
‘রাহিদ, রাহিদ ...’
দূর থেকে ছেলের দলের কণ্ঠ ভেসে আসে। বাড়ির পুরুষেরা ঘটনা জানতে বাজারের দিকে ছুটে গেলে পাথরের মতো স্থির স্তব্ধ আকলিমা ভাবে, সত্যি সত্যি, মাইরা ফেলছে? একটা জলজ্যান্ত জোয়ান মানুষকে জানে মাইরা ফেলা কি এত সহজ? রাহিদ ভাইয়ের মতো একজন মানুষ ক্যামনে পারল এক রক্তের এক গোষ্ঠীর, বন্ধুর মতো ভাইকে খুন করতে? সেই বোকাসোকা দুবলা পাতলা নিরীহ ভালো মানুষ রাহিদ ভাই। আকলিমার প্রতি নিজের অপরিসীম দুর্বলতাটুকু যিনি শত চেষ্টাতেও কোনো দিন আড়াল করতে পারেন নাই। অথচ পরিবারের সিদ্ধান্তে অবস্থাপন্ন ঘরের মিরাজের সাথে আকলিমার বিয়ে হবে সেটাই জানত সবাই। তারপরও নিজের বিধবা মাকে বলে কয়ে আকলিমার বাবার কাছে পাঠিয়েছিলেন রাহিদ ভাই। আকলিমার প্রতি রাহিদ ভাইয়ের এই গোপন দুর্বলতা কিভাবে যেন টের পেয়ে গিয়েছিল ফুর্তিবাজ মিরাজ। রাগ করেনি সে বরং তার কাছে এটা ছিল এক ধরনের কৌতুক। বাচ্চা ছেলেরা যেমন শুধু মজা করতে অকারণে পুকুরের ব্যাঙদের দিকে ঢিল ছোড়ে তেমনি ছেলেমানুষি আনন্দে সারাক্ষণ এটা নিয়ে সে রাহিদকে খোঁচাত।
‘জোলা বাড়ির মাইয়াগুলি ঝগড়াইট্যা কিন্তু গড়ন গঠন সুন্দর আছে! তোর জন্য বিয়ার প্রস্তাব দিমু নাকি ভাই?’
রাহিদ ভয়ংকর ক্ষেপে যেত এসব রসিকতায়, ‘তুই গিয়া জোলা বাড়িতে বিয়া কর! যা!’
রাহিদকে রাগিয়ে মজা পেয়ে শব্দ করে গা কাঁপিয়ে হাসত মিরাজ।
গত ঈদের আগের রাতের কথা মনে পড়ে আকলিমার। সে বারান্দায় মাদুর পেতে বসে হাতে মেন্দি পরছিল। শহর থেকে তার জন্য একটা মোবাইল ফোন কিনে এনেছিল রাহিদ। এদিক ওদিক তাকিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে আকলিমার দিকে মোবাইলের বাক্সটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘এই ফোনটা তোমার জন্য, আমার সামান্য উপহার। রাখো। স্মার্ট ফোন। টাচ স্ক্রিন। ক্যামেরাটাও খুব ভালো।’
এ সময় কোথায় থেকে যেন চিলের মতো দুই ডানা মেলে উড়ে এসেছিল মিরাজ। ছোঁ মেরে বাক্সটা তুলে নিয়েছিল সে।
‘ভাই, এইটা কি আমাদের বিয়ার আগাম উপহার দিলি? তাইলে এটা আমার...’
নিজের পুরনো মোবাইল ফোনটা আকলিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে মিরাজ বলেছিল, ‘তুমি এইটা রাখো, রাহিদ যেইটা দিছে সেইটা আমার। আমি নিব।’
রাগে দুঃখে রাহিদের ফর্সা মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।
‘না, তুই নিবি না। এইটা আকলিমার জন্য আনছি, ওরে দে.. ’
মিরাজ কি আর রাহিদের কথা শোনার পাত্র? নতুন ফোনের মোড়ক খুলে সে ততক্ষণে আপন আনন্দে মাতোয়ারা।
‘দারুণ ফোনরে ভাই! হেব্বি একটা মাল আনছোস! এইটা কিন্তু আমার হাতেই মানায়!’
রাহিদ কয়েকবার চেষ্টা করল ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিতে, কিন্তু না পেরে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না, কুকুরের মতো হিংস্র ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিরাজের ওপর। কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তিও হলো। বড়রা হৈ হৈ করে তাদের বিরোধ ছোটাতে এগিয়ে এলো। কিন্তু অবধারিতভাবে মিরাজের তাগড়া শরীরের শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত রাহিদ ভাঙা গলায় সবার সামনে চিৎকার করে বলল, ‘তরে আমি খুন করুম মিরাজ! তরে মাইরা ফালামু!’
রাহিদের এমন ফাঁকা বুলির তোয়াক্কা না করে মিরাজ যথারীতি হাসিমুখে শিস দিতে দিতে ফোন নিয়ে চলে গিয়েছিল।
আকলিমার চোখ পানিতে ভরে ওঠে। রাহিদ ভাই অনেক দিন আগে তাকে এক লাইনের একটা চিঠি লিখেছিল, ‘এই জীবনে তোমাকে তো পাব না, মরণের পরে যদি জীবন থাকে সে জীবনে প্রিয়া তুমি আমার হবে।’
চিঠির নিচে একটা আঁকাবাঁকা গোলাপ ফুল আঁকা। কোনো নাম ধাম পরিচয় নাই। চিঠির কথা জানতে পারলে ঠাট্টা মশকরা করে রাহিদকে অপদস্ত করবে বলে মিরাজকে কোনো দিন চিঠিটা দেখায় নাই আকলিমা। আহা, একজন পরাজিত মানুষ যদি মৃত্যুপরবর্তী বিজয়ী জীবনের অলীক স্বপ্নে বিভোর থেকে এই জীবনটা একটু শান্তিতে কাটাতে চায়, তবে খামোখা তাকে বিব্রত করার দরকার কী?
‘এইটা তুমি কী করলা রাহিদ ভাই?’ আকলিমা ডুকরে কেঁদে ওঠে।
‘অতঃপর তার আত্মা তাকে ভ্রাতৃ হত্যার কাজে প্ররোচিত করল। ফলত সে তাকে হত্যা করল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ সুরা আল মায়েদা আয়াত ৩০।
পুলিশকে খুব বেশি কষ্ট করতে হলো না, রাহিদকে তার বাড়িতেই পাওয়া গেল। শূন্য দৃষ্টি, মলিন বিপর্যস্ত চেহারা। অকাট্য প্রমাণও ছিল, কেননা রাহিদের পরনের সাদা পাঞ্জাবিতে মিরাজের রক্তের দাগ, শুকিয়ে কালচে হয়ে অপরাধের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
পুলিশ বলল, ‘মিরাজউল্লাহকে তুমি মার্ডার করছ?’
রাহিদ মাথা নিচু করে থাকল, কোনো উত্তর দিল না। উত্তর না পেয়ে বরাবরই অভ্যন্ত পুলিশ তার দুহাতে হাতকড়া পরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন মারছো?’
রাহিদ অস্ফুট কণ্ঠে প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে বলল, ‘ও চুরি করছে। আমার মোবাইল।’
পুলিশ যখন গ্রামবাসীর সামনে রাহিদকে নিয়ে তাদের গাড়িতে তুলল, উঠানের কাপড় ঝোলানোর তারে বসে থাকা কাকটা ডাকল, ‘কা কা।’
রাহিদ শুনল কাকটা হাসছে,‘হা হা হা’।