শোকে ধৈর্যধারণ মুমিনের গুণ

সুখ-দুখের সমন্বয়েই জীবন। কখনো মানুষের জীবন আনন্দে ভরে ওঠে। আবার কখনো গভীর শোকের মুখোমুখি হতে হয়। প্রিয়জনের মৃত্যু, অসুস্থতা, বিপদ, সম্পদের ক্ষতি কিংবা কোনো প্রিয় কিছু হারানোর বেদনা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। শোক মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। ইসলাম শোক প্রকাশকে নিষেধ করেনি। তবে শোকের সময় নিজেকে সামলে রাখা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দিয়েছে। এটাই মুমিনের ধৈর্য।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষতি দিয়ে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা বিপদে পতিত হলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা আল বাকারা ১৫৫-১৫৬)

এই আয়াত মুমিনের জীবনে শোকের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বিপদ এলে মানুষকে মনে রাখতে হবে, তার জীবন ও তার প্রিয় সবকিছুই আল্লাহর দেওয়া আমানত। আল্লাহ চাইলে তা ফিরিয়ে নিতে পারেন। তাই প্রিয়জন হারানোর কষ্ট থাকলেও মুমিন আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করে না। বরং ধৈর্য ধরে এবং তার কাছে সাহায্য চায়।

শোকের সময় কান্না করা মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রিয়জনের মৃত্যুতে কেঁদেছেন। তার ছেলে ইবরাহিমের মৃত্যু হলে তিনি কেঁদেছিলেন। তখন তিনি বলেন, ‘চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়। তবে আমরা এমন কথাই বলব, যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন।’ (সহিহ বুখারি)

এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের আবেগকে অস্বীকার করে না। কষ্ট পাওয়া অপরাধ নয়। চোখে পানি আসাও অপরাধ নয়। তবে শোকের সময় এমন কথা বা কাজ করা যাবে না, যা আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। বিলাপ করা, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা মুমিনের জন্য শোভন নয়।

ধৈর্য মানে কষ্ট না পাওয়া নয়। ধৈর্য মানে কষ্টের মধ্যেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। বিপদের সময় জিহ্বাকে সংযত রাখা। আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা রাখা। নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে তার কাছে ফিরে যাওয়া। এই ধৈর্যই মুমিনের শক্তি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)

আল্লাহর এই ঘোষণা মুমিনের জন্য বড় সান্ত¡না। মানুষ যখন শোকে একা হয়ে যায়, তখনো সে একা নয়। আল্লাহ তার সঙ্গে আছেন। তার কান্না আল্লাহ জানেন। তার কষ্ট আল্লাহ জানেন। তার হৃদয়ের ব্যথাও আল্লাহর অজানা নয়।

শোকের সময় ধৈর্যধারণের অন্যতম উপায় হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। মুমিন বিশ্বাস করে, আল্লাহ যা করেন তা প্রজ্ঞার ভিত্তিতেই করেন। মানুষের জ্ঞান সীমিত। সে অনেক কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ সবকিছু জানেন। তাই কোনো বিপদ তার কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও আল্লাহর কাছে তা অজানা নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক। তার সব বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। এটি শুধু মুমিনের জন্যই। সে সুখ লাভ করলে শুকরিয়া আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে, তাও তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম)

লেখক : ইসলামি গবেষক