কথাবার্তায় সংযম কেন জরুরি

কথা মানুষের পরিচয় বহন করে। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলেন, তা দেখেই তার রুচি, শিক্ষা ও চরিত্র সম্পর্কে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। সুন্দর কথা মানুষকে কাছে আনে। কঠিন কথা দূরে সরিয়ে দেয়। একটি ভালো কথা মানুষের মনে আনন্দ তৈরি করতে পারে। আবার একটি কটু কথাও দীর্ঘদিন মনে দাগ রেখে যেতে পারে। তাই ইসলামে কথাবার্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মহান আল্লাহ মানুষকে শুধু কথা বলার ক্ষমতাই দেননি, সেই কথার সঠিক ব্যবহারও শিখিয়েছেন। কখন কথা বলতে হবে, কী বলতে হবে এবং কীভাবে বলতে হবে, তারও নির্দেশনা দিয়েছেন। সুরা লোকমানে হজরত লোকমান (আ.) তার সন্তানকে যে নসিহত করেছেন, সেখানে মানুষের আচরণ ও কথাবার্তারও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর স্বর হলো গাধার স্বর।’ (সুরা লোকমান ১৯)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের আচরণে ভারসাম্য এবং কথাবার্তায় সংযমের শিক্ষা দিয়েছেন। অকারণে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা, চিৎকার করা কিংবা নিজের বক্তব্য জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একজন মুমিনের সুন্দর চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়।

কথাবার্তায় সংযম মানে প্রয়োজনীয় কথা না বলা নয়। বরং প্রয়োজনীয় কথা সুন্দরভাবে বলা। মানুষকে কষ্ট না দিয়ে সত্য বলা। নিজের মত প্রকাশ করার সময় অন্যের সম্মান বজায় রাখা। রাগের সময়ও নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করা। এটাই কথাবার্তার সংযম।

কথা বলার আগে ভাবা : মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া একটি কথা অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কথা বলার আগে একটু ভাবা দরকার। কথাটি সত্য কি না, প্রয়োজনীয় কি না এবং এতে অন্যের অকারণে কষ্ট হবে কি না, তা বিবেচনা করা উচিত।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস কথাবার্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কথা বলার সুযোগ থাকলেই কথা বলতে হবে এমন নয়। ভালো কথা বলার সুযোগ না থাকলে নীরব থাকাও একজন মুমিনের গুণ।

রাগের সময় সংযম : রাগের সময় মানুষের মুখের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। তখন অনেকেই এমন কথা বলে ফেলেন, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনো বলতেন না। পরে অনুতাপ হয়। কিন্তু বলা কথা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

তাই রাগের সময় চুপ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কণ্ঠস্বর নিচু করা জরুরি। তর্ক বাড়িয়ে না দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা উচিত। পরিবারের মধ্যকার অনেক বিরোধও এভাবে এড়ানো সম্ভব।

কঠিন কথাও সুন্দরভাবে বলা যায়। কাউকে সংশোধন করতে হলে তাকে অপমান করার প্রয়োজন নেই। ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সময় সম্মান বজায় রাখা যায়। এতে কথা মানুষের হৃদয়ে সহজে পৌঁছে।

কটু কথা থেকে বিরত থাকা : ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষা করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কাউকে উপহাস করা, অপমান করা, বিদ্রƒপ করা কিংবা কটু নামে ডাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত ১১)

এই আয়াত মানুষের মুখের ভাষার ব্যাপারে সতর্ক করে। কাউকে ছোট মনে করে কথা বলা ঠিক নয়। বাহ্যিক অবস্থান দেখে কাউকে তুচ্ছ করা উচিত নয়। মানুষ জানে না, আল্লাহর কাছে অন্য ব্যক্তি তার চেয়ে কত বেশি মর্যাদার অধিকারী।

গিবত ও অপবাদ থেকেও জিহ্বাকে রক্ষা করতে হবে। মহান আল্লাহ গিবতকে অত্যন্ত কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। তাই কথাবার্তার সংযম শুধু কণ্ঠস্বর নিচু রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং জিহ্বাকে সব ধরনের অন্যায় কথা থেকে রক্ষা করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

তর্কে সংযম : মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। একই বিষয়ে সবার মত এক হবে না। কিন্তু মতের পার্থক্য মানেই ঝগড়া নয়। নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সময়ও অন্যের সম্মান বজায় রাখা দরকার।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।’ (সুরা নাহল ১২৫)

সত্য কথা বললেও ভাষা সুন্দর হওয়া প্রয়োজন। যুক্তি থাকলেও অহংকার করা যাবে না। নিজের কথা ঠিক প্রমাণ করার জন্য অন্যকে অপমান করা কোনোভাবেই সুন্দর আচরণ নয়।

পরিবারে কথার সংযম : কথাবার্তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের মধ্যে। বাইরে আমরা অনেক সময় ভদ্রভাবে কথা বলি। কিন্তু ঘরের মানুষের সঙ্গে রাগ দেখাই। বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোনের সঙ্গে কঠিন ভাষায় কথা বলি। অথচ কাছের মানুষের মনেই কথার আঘাত সবচেয়ে বেশি লাগে।

ইসলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সঙ্গে উফ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা ইসরা ২৩)

এখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার ক্ষেত্রে যে সৌন্দর্য শেখানো হয়েছে, তা আমাদের সব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গেও সুন্দরভাবে কথা বলতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংযম : বর্তমানে কথাবার্তার বড় একটি অংশ হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এখানে মুখোমুখি কথা বলতে হয় না। তাই অনেকেই এমন মন্তব্য করে ফেলেন, যা সামনে থাকলে হয়তো বলতেন না।

কিন্তু লিখিত কথারও প্রভাব আছে। একটি মন্তব্য কাউকে আনন্দ দিতে পারে। আবার একটি কটূক্তি কাউকে গভীরভাবে কষ্ট দিতে পারে। তাই সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করার সময়ও কথাবার্তার ইসলামি নীতি মনে রাখা দরকার।

কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে গালাগাল করা, অপমান করা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রয়োজন না থাকলে বিতর্কে জড়ানোও ঠিক নয়। কারণ প্রতিটি কথা মানুষের চরিত্রের পরিচয় বহন করে।

কথার হিসাব দিতে হবে : মানুষ অনেক সময় কথাকে খুব সাধারণ বিষয় মনে করে। মনে করে, কথা তো শুধু কথাই। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের কথা গুরুত্বহীন নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা কাফ ১৮)

এই আয়াত একজন মুমিনকে নিজের জিহ্বার ব্যাপারে সতর্ক করে। আমরা যে কথা বলি, তা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই কথা বলার আগে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

সংযত কথা মুমিনের সৌন্দর্য : একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু তার পোশাক, বাহ্যিক পরিচয় বা ইবাদতের মধ্যে প্রকাশ পায় না। তার কথাবার্তাতেও ইমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। সে সত্য কথা বলে। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলে। কাউকে অপমান করে না। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। মতের পার্থক্য হলেও শালীনতা বজায় রাখে।

জিহ্বা ছোট একটি অঙ্গ। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বড়। এই জিহ্বা দিয়ে মানুষ ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে। আবার এর মাধ্যমেই সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। কাউকে সান্ত¡না দিতে পারে। আবার কাউকে গভীরভাবে আহতও করতে পারে। তাই মুমিনের উচিত নিজের কথাকে নিয়ন্ত্রণ করা।

কথা বলার আগে একটু থামা, প্রয়োজন বুঝে কথা বলা, কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করা, রাগের সময় নীরব থাকা এবং কাউকে কষ্ট দেয় এমন কথা থেকে বিরত থাকার বিষয়টি জীবনে শান্তি আনতে পারে। পরিবারে ভালোবাসা বাড়াতে পারে। সমাজে পারস্পরিক সম্মান তৈরি করতে পারে।

আমাদের চলাফেরা, ব্যবহার এবং কথাবার্তা সবকিছুতেই সংযম থাকা দরকার। তাই একজন মুমিনের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কথা হওয়া উচিত সত্য, প্রয়োজনীয়, সুন্দর ও কল্যাণকর।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক