এমপি গাজী নজরুল প্রথম স্ত্রীসহ রিমান্ডে

ন্যাম ভবনে মরিয়মের লাশ নেপথ্যে মামা ওবায়দুর!

গত রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাম ভবন থেকে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদিকে গাজী নজরুলের সঙ্গে পরিচয়-বিয়ে, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং সবশেষে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একটি নাম ওবায়দুর রহমান। তিনি মরিয়মের মামা এবং এমপি নজরুলের গাড়িচালক। তার আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এমপি গাজী নজরুল, তার বড় স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করেছেন মরিয়মের বাবা। বর্তমানে এমপি নজরুল ও মাকছুদা পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে থাকলেও পলাতক রয়েছেন ওবায়দুর।

মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ, মেয়ে মরিয়মকে গাজী নজরুলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল শ্যালক ওবায়দুরের। টাকার লোভে তিনিই মরিয়মকে ওই সম্পর্কে টেনে নিয়ে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেন। গতকাল সোমবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ করেন তিনি। তার এই অভিযোগ এখন পুলিশি তদন্তের কেন্দ্রে। পুরো ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন ওবায়দুর কি মরিয়মের জীবনে এমপি গাজী নজরুলের প্রবেশ থেকে শুরু করে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। মরিয়ম ও গাজী নজরুলের সম্পর্কের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। গাজী নজরুলের বক্তব্যেও মরিয়মের মামা ওবায়দুরের নাম এসেছে।

জুলাইয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যক্তিগত ভিডিও নিয়ে গাজী নজরুল জানিয়েছিলেন, ১৩ জুলাই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে মগবাজারে মরিয়মের বাবার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ওবায়দুর বাইরে যাওয়ার পর কয়েকজন লোক নিয়ে ফিরে এসে তাদের জিম্মি করেন এবং টাকা দাবি করেন এমন অভিযোগ করেছিলেন গাজী নজরুল। এ ঘটনার পর থেকেই ওবায়দুরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।

মর্গের সামনে বাবা-মায়ের আর্তনাদ : গতকাল সকাল ৯টার দিকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ের লাশের জন্য বসে আছেন মাসুম বিল্লাহ দম্পতি। মেয়েকে হারিয়ে বাবা কাঁদছেন। এ সময় গণমাধ্যমকে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমি তো চাই সঠিক তদন্ত, আমি যেন ন্যায় বিচারটা পাই; প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়। মেয়ের সঙ্গে শেষ কী ॥কথা হয়েছিল এবং কোনো কষ্টের কথা বলেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সঙ্গে কথা কম হতো, তবে এমপির সঙ্গে সবসময় কথা হতো, পাশে থাকত; কথা বলতে গেলে ও কথা বলত না।

এ ঘটনার জন্য শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে দায়ী করে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘মেয়ে বলত আমি বাইরে কীভাবে মুখ দেখাব। সে আমার মামা, এত বড় ক্ষতি করবে বুঝতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দেন, বাপের থেকে তাকে বেশি বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করে আজকে ওই পরিণতি ভোগ করছি। মেয়ে এসব বলে আমার পা জড়ায় ধরে কান্নাকাটি করত। ওই ঘটনা না ঘটলে ওরে এমপি হোস্টেলে আইসা থাকা লাগে না, তাহলে এই ঘটনাও ঘটত না।’ গাজী নজরুল সম্পর্কে মাসুম বিল্লাহর আপন খালু, তার সঙ্গে কী করে মেয়ে সম্পর্কে জড়াল জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক পরে জানতে পারছি। কিন্তু ওর মামার জন্য এভাবে সব শেষ হয়ে গেল। ন্যাম ভবন থেকে উদ্ধার চিরকুটগুলোর বিষয়ে মাসুম বলেন, এগুলো ওর লেখা কি না, সেটা আমি বলতে পারছি না। আমি ওর লেখা চিনি না।

মৃত্যুর দিন কী ঘটেছিল : গত রবিবার ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয়তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। মরিয়মের হাতে লেখা কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এরপর তার বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়। এমপি গাজী নজরুলের ভাষ্য অনুযায়ী পুলিশ বলছে ওই ফ্ল্যাটে দুই স্ত্রীকে নিয়েই থাকতেন তিনি। ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের লাশ উদ্ধার থেকে সুরতহাল প্রতিবেদন করার সময় এমপি নজরুল পুলিশের সঙ্গেই ছিলেন। রাতে তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর তিনি কোনো কথা বলেননি।

অভিযোগ অস্বীকার নজরুলের : দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। গতকাল সোমবার রিমান্ড শুনানি শেষে আদালতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম না। মরিয়ম আত্মহত্যা করেছে।’ শুনানি শেষে গাজী নজরুলকে চার দিনের এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, মরিয়ম গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যাওয়ার সময় আসামিরা বাসায় ছিল। ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়-ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় ধাবিত করেছেন কি না তা জানা প্রায়োজন। এ ছাড়া পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং গ্রেপ্তারসহ মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে আসামিদের রিমান্ডের প্রায়োজন।

মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে : গত জুনে গাজী নজরুলের সঙ্গে ভুক্তভোগীর ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। আসামি ওবায়দুর রহমানের প্ররোচনায় এ বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করত বলে বিভিন্ন সময় মোবাইলে তার পরিবারকে জানায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টায় গাজী নজরুল ভুক্তভোগীর বাবা মাসুম বিল্লাহকে মোবাইল ফোনে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন মরিয়ম ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছে। পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় বিছানার ওপর তার লেখা সুসাইড নোট পান। আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং আসামিদের প্ররোচনায় মরিয়ম আত্মহত্যা করেছে।

ঘর থেকে মিলেছে একাধিক চিরকুট : তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সামনে এসেছে মরিয়মের লেখা একাধিক চিরকুট। পুলিশ জানিয়েছে, মরিয়মের কক্ষ থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো যাচাই করা হচ্ছে। চিরকুটের কয়েকটি অংশে বিশ্বাসভঙ্গ, সম্পর্কের টানাপড়েন ও মানসিক কষ্টের কথা উঠে এসেছে। এদিকে ভিডিও সামনে আসার পর গাজী নজরুল জানান, মরিয়ম তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি ছিল, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর সম্পর্কটি স্বাভাবিক ছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।

ওবায়দুরের বক্তব্যেও টাকার প্রসঙ্গ : মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মামা ওবায়দুর নিজেও আগে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের সম্পর্কের বিষয়টি তিনি জানতেন এবং বিষয়টি পরিবারের সামনে তুলেছিলেন। একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওবায়দুর দাবি করেছিলেন, মরিয়মের বাবা বলেছিলেন ‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে’ এবং পাঁচ বছরে অনেক কিছু করে নেওয়ার কথা। তিনি আরও দাবি করেছিলেন, মরিয়মের বাবাকে গাজী নজরুল ঠিকাদারি লাইসেন্স করে দিয়েছিলেন এবং তাকে বড় হওয়ার সুযোগ দেখানো হয়েছিল।

নজরুলের এমপি পদ নিয়ে কী হচ্ছে : গ্রেপ্তার গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ সোমবার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো সংসদ থেকে কোনো চিঠি নির্বাচন কমিশনে আসেনি। সংসদ থেকে চিঠি পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছিল, কিন্তু আইন অনুযায়ী সংসদ থেকে চিঠি না এলে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ইসির নেই। সংসদ সচিবালয় থেকে আমাদের জানানোর বিধান রয়েছে। এখনো চিঠি আসেনি।

নজরুলের বিষয়ে জামায়াতের বক্তব্য নেই : গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, এমপি গাজী নজরুল এখন জামায়াতের সঙ্গে নেই। আইন অনুযায়ী যা হওয়ার তাই হবে। এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর কোনো বক্তব্য নেই। দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় গত ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার সংসদ সদস্যপদ নির্ভর করছে স্পিকার ও ইলেকশন কমিশনের ওপর।

নজরুলের শাস্তি চেয়ে বিক্ষোভ : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরায় মরিয়মকে দাফন করা হয়েছে। এদিকে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শ্যামনগর উপজেলা বিএনপি। ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরিতে আদালত প্রতিবেদক এবং সাতক্ষীরা শ্যামনগর প্রতিনিধি সহযোগিতা করেছেন।