কারণ নিয়েই জল্পনাকল্পনা

কেবল আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া নয়, শত্রুতা ও আর্থিক লেনদেনের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে খুন হয়ে থাকতে পারে কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। যত সময় যাচ্ছে ততই এ বিষয়গুলো সামনে আসছে। অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমও হত্যাকা-ের পেছনে এ দুটি ঘটনা কাজ করেছে বলে মনে করছেন। এদিকে অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে দুই আসামিকে কুমিল্লা কারাগারে, দুই কিশোরকে টঙ্গী শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এই মর্মান্তিক হত্যার প্রতিবাদে কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে।

কেবল একটি দামি আইফোনের জন্য বন্ধুরাই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে এটা মেনে নিতে পারছেন না কেউই। এ অবস্থায় পূর্বশত্রুতা ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও সামনে আসছে। এ নিয়ে সর্বত্র চলছে জল্পনাকল্পনা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘ইয়েসটেক’-এ কাজ করা এক কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল বলে জানা যায়। কিশোরটি ছিল নেশাগ্রস্ত। এই টাকা ফেরত না দিয়ে কীভাবে থাকা যায় তার উপায় বের করতেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘কিং অব কোটবাড়ি’র সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে আসছে। খোঁজ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গ্রুপটির অস্তিত্ব এবং অপ্রতিমের উপস্থিতির একাধিক ছবিও পাওয়া গেছে। এই গ্রুপটি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত বলে অনেকে মনে করছেন। 

অপ্রতিমের মা কুবির বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ওপর ক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করল কি না সে বিষয়টিও সামনে আসছে।

গতকাল সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনেও বিষয়টি আলোচিত হয়। বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার বলেন, অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও তিনি কয়েকটি সন্দেহের কথা এখানে জানাতে বলেছেন।

অপ্রতিমের মায়ের বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিল। অপ্রতিমের মা মনে করেন, ওই কিশোরের অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ নেওয়ার সঙ্গে হত্যাকা-ের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

কামরুন নাহার আরও বলেন, নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কুমিল্লার স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে পুলিশে দিয়েছিলেন। ওই কিশোর গ্যাং দলের নেতৃত্ব মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) দিতেন বলে অপ্রতিমের মা দাবি করেন। ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা।

স্কুলে শূন্যতা : কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ‘ক’ শাখার হাজিরা খাতায় লেখা নামটি এশায়াত শাহরিয়ারের। শ্রেণি রোল ২৯, আইডি নম্বর ২৫৬০০৭। কিন্তু শ্রেণি শিক্ষক মহিবুল্লাহ আর কোনোদিন ক্লাসে রোল ডাকতে গিয়ে এই নম্বরটি উচ্চারণ করবেন না। বিদ্যালয়ের প্রাণবন্ত ছাত্র এশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম চিরতরে হারিয়ে গেছে। ও আর কোনোদিন ফিরবে না এমন নিখাদ শোকে এখন বিষন্ন শিক্ষক ও সহপাঠীরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, হাজিরা খাতা অনুযায়ী চলতি মাসের ১, ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর তিন দিন অনুপস্থিত ছিল অপ্রতিম। সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সে বিদ্যালয়ে আসে। পরদিন ছুটি দিন শুক্রবার নিখোঁজ হওয়ার পর তার লাশ পাওয়া গেছে জঙ্গলে। এরপর গত রবিবার স্কুল খোলার পর যথারীতি হাজিরা ডাকার সময় ২৯ নাম্বার রোলের আগে থেমে যান শিক্ষক। শিক্ষার্থী ভর্তি শ্রেণিকক্ষে কেবল নেই চিরচেনা ছাত্র অপ্রতিম। তার নামের পাশে জমা পড়েছে অনুপস্থিতির চিহ্ন।

অপ্রতিমের সহপাঠী সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলে, শুক্রবার বিকেলে ফেসবুকে যখন দেখলাম আমাদের বন্ধু নিখোঁজ, তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। সে হারিয়ে যাওয়ার মতো ছেলে না, নিশ্চয়ই ওকে কেউ কিছু করেছে। বিদায়ের আগের দিনের কথা স্মরণ করে আরিফ আরও বলে, হারিয়ে যাওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলেও আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলেছি। তখন তো বুঝতেই পারিনি, এটাই ওর সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলে আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম, হাসাহাসি করতাম। সে আজ আর আমাদের মাঝে নেই, এই বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

মো. সিয়াম নামে অপর এক সহপাঠী কেঁদে উঠে বলে, অপ্রতিমকে শেষবারের মতো বিদায় দিতে এসে বুক কেঁপে উঠছে। এত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় দেব, এটা ভাবতেও পারিনি। ক্লাসে তার শূন্যতা কোনোদিনও পূরণ হবে না।

মামলার আসামিরা কারাগারে : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর দক্ষিণ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামিকে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা কারাগার কর্র্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর মধ্যে আদালত দুই কিশোর আসামি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এই দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানো হয়েছে। অন্য দুই আসামি তুহিন ও সিয়ামকে রাখা হবে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর মধ্যে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঘটনার পূর্বাপর : গত শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে  বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিমের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তার বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানান্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুবির সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে। 

গত রবিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তারা রবিবার রাতে কুমিল্লার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ছাড়াও সন্দেহভাজন হিসেবে সিয়াম নামে একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সিয়াম ছাড়া বাকি তিনজন তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল রবিবার রাতে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।