বিরূপ প্রভাব নানা খাতে জনমনে উদ্বেগ

প্রায় ছয় মাসে সব ধরনের নিত্য ব্যবহার্য জ্বালানি তেলের দাম ৩৩ থেকে ৩৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত রবিবার দাম বৃদ্ধির পর সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্য-সংকটজনিত পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আর বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে নানা খাতে। পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বাড়তি খরচ জোগানোর চিন্তায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। অন্যদিকে সরকারের হাতে পরিশোধন ক্ষমতা না থাকায় জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে হামলা চালায়। মার্চজুড়ে হামলা ও পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এতে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হলে তেলের বাজার আবার নিম্নমুখী হয়। শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে গত ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্র ফের ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। ফলে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বড় অংশের জোগানদাতা এসব দেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। গত ১৭ এপ্রিল রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। পরে দাম কমলে তা সমন্বয় করা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জনগণের কাছে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। গতকাল প্রতিমন্ত্রী দাম বাড়ানোর পর একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঝুঁকিতে পড়বে।’

মাত্র ছয় মাসে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। কারণ পণ্য ও সেবার দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এপ্রিলে তেলের দাম বাড়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হয় ২ টাকা ৫৩ পয়সা। দূরপাল্লার পথে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা হয়। একই পরিমাণ তেলের দাম আবার বাড়ায় আবারও বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবহন মালিকরা। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কেবল বাসের ভাড়া নয়, সব পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বাড়াবে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দরে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন ও পণ্যপরিবহনের খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামও আরেক দফা বাড়তে পারে।’ 

তিনি বলেন, আগেও বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এবারও তেলের দাম বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সংকট মোকাবিলায় বিপিসির অতীতের মুনাফার অর্থের ব্যবহার ও জ্বালানি খাতের অপচয়-অনিয়ম বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

শোধিত জ্বালানি তেলের পার্থক্য : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপিসি প্রতি ব্যারেল ডিজেল কিনেছে ৮৬ ডলারে। আগস্টে ডিজেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ১৪৮ দশমিক ৫৭ ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ৭৪ দশমিক ৩ ডলার, আগস্টে যা ছিল ১০৮ দশমিক ৩২ ডলার। ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল প্রতি টন ৪২৮ দশমিক ০৮ ডলার, আগস্টে যা ছিল ৫৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। দেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ টনের বিপরীতে দেশের পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। তবে গড়ে ১২ লাখ টন তেল পরিশোধন করা হয়। অর্থাৎ ৫৮ লাখ টনই পরিশোধিত তেল কেনা হয়। পরিশোধিত তেল কিনতে সরকারকে বাড়তি মূল্য গুনতে হয়।

বাংলাদেশ কেন জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না : আন্তর্জাতিক বাজারে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান-সংকটের আগে ব্যারেলপ্রতি অশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) গড় দাম ছিল ৭১ দশমিক ১৫ ডলার। মার্চে দাম বেড়ে হয় ১০৩ দশমিক ৮৯ ডলার, এপ্রিলে ছিল ১২১ দশমিক ৬৭ ডলার, মে মাসে ছিল ১০৭ দশমিক ৫৫ ডলার, জুনে ৮৫ দশমিক ৪৭ ডলার, জুলাই মাসে ৮৩ দশমিক ৪১ ডলার, আগস্টে বেড়ে হয় ৯০ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত গড় দাম ৬৭ দশমিক ৪৩ ডলার। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমেছে। তাহলে দেশে কেন দাম বাড়ে?

এমন প্রশ্নে বিপিসির ওই কর্মকর্তা জানান, ফেব্রুয়ারিতে মেরিন ফুয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ৪৭০ দশমিক ৪৩ ডলার, এখন যা বেড়ে হয়েছে ৫৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। তেল আনার জাহাজ ভাড়াও বেড়ে গেছে। তেলের বাজারমূল্য বাড়ায় ইন্স্যুরেন্স চার্জও বেড়েছে। বেড়েছে প্রিমিয়াম। সব কিছু যোগ করলে শোধিত জ্বালানির দাম অনেকাংশে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিশোধন ক্ষমতা কম, তেল সংরক্ষণ ক্ষমতাও কম। আমরা তিন মাসের তেলও সংরক্ষণ করতে পারি না। কিন্তু অনেক দেশ এক বছরের বেশি তেল মজুদ রাখতে পারে। সেসব দেশের পরিশোধন ক্ষমতা বেশি। বিশ্ববাজারে যখন অশোধিত তেলের দাম কম থাকে, তখন তারা বেশি করে তেল কিনে পরিশোধন করে রাখে। বিপরীতে বিপিসির না আছে পরিশোধন ক্ষমতা, না আছে মজুদের ক্ষমতা। ফলে তেলের দাম বছরের কোনো সময়ে কমলে বাংলাদেশ বিশেষ কোনো সুবিধা নিতে পারে না।’

বিশ্বে তেল উৎপাদন কমেছে : আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রতিবেদন বলছে, আগস্টে বিশ্বে তেল উৎপাদন আগের মাসের তুলনায় দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল কমে ১০ কোটি ১ লাখ ব্যারেলে নামে। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ১ কোটি ব্যারেলের বেশি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বে মোট তেল সরবরাহ দৈনিক ৫৭ লাখ ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার আশা ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে বলে এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ২০২৭ সালে উৎপাদন দৈনিক ৮০ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ওপর।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, সরকারের কোনো কিছুই ঠিকঠাক কাজ করছে না। সরকার বলছে এক কথা আর করছে অন্য কাজ। দায়িত্ব নিয়ে সরকার বলেছিল, দুই বছর তেলের দাম বাড়বে না। ছয় মাসের মধ্যেই দাম বেড়েছে দুইবার। বলছে, সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সোলার করবে। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দেশে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধানের যে অবস্থা, তাতেও আশাজাগানিয়া কিছু নেই। এসব দিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে, না হলে আমরা বিপাকে পড়ব।