এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না

আশুলিয়ায় মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসে আর বাড়িতে ফেরা হলো না জয়নব ওরফে সালমা বেগমের (৫০)। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় রক্তাক্ত জয়নবের। মাত্র চারদিন আগে জামগড়ায় মেয়ে সানজিদার বাসায় বেড়াতে আসেন তিনি। গত রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের ‘এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’-এ সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে জয়নবসহ আটজন মারা যান এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।

ঘটনাস্থল এবং সানজিদার বাসায় গিয়ে কাউকে পাওয়া জায়নি। খালি পড়ে আছে দর্জির দোকান, সেখানে ফ্লোরে পড়ে আছে নিহত জয়নাবের মাথার খুলি-সদৃশ বস্তু। জানা যায়, সম্প্রতি সানজিদা জামগড়া এলাকায় দর্জির দোকান ভাড়া নেন। ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দোকান চালাতেন। গত রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে প্রীতি গ্রুপ চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা। এতে আট থেকে নয়টি সিলিন্ডারবাহী লরি পুড়ে যায়। তখন সানজিদার মা জয়নব ও ছোট ভাই ছিলেন দোকানে। বিস্ফোরণে উড়ে আসা সিলিন্ডারের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জয়নব। মাথার খুলি ভেঙে সেখানেই মৃত্যু হয় জয়নবের। তবে প্রাণে বেঁচে যান জয়নবের ছেলে।

দর্জির দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুদি দোকানি জানান, একটি সিলিন্ডার আমাদের দোকানেও আঘাত হেনেছে। তবে কেউ হতাহত হয়নি। ভয়াল সে সময় আমরা মৃত্যু আতঙ্কে ছিলাম। জয়নব বেগমের এমন মৃত্যু খুব কষ্টদায়ক। সিলিন্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় জয়নবের। এদিকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ঢাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুল জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনায় ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিটুস লরেন্স চিরানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রীতি গ্রুপের পাঁচটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নোটিসে বলা হয়েছে, সোমবার প্রীটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, প্রীতি কম্পোজিট গার্মেন্টস লিমিটেড, অক্সফোর্ড কালারস লিমিটেড ও এস সুহী ইন্ডাস্ট্র্রিয়াল পার্ক লিমিটেড বন্ধ থাকবে। তবে বন্ধ রাখার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নোটিসে উল্লেখ করা হয়নি।

গতকাল সোমবার সরেজমিন প্রীতি গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক বন্ধ। সেখানে কারখানা শ্রমিক ও স্থানীয়দের উপস্থিতি দেখা যায়। কারখানা কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কারখানার মূল ফটকের সামনে বিভিন্ন দোকানপাটের গ্লাস ভেঙে পড়ে রয়েছে। আশপাশের কারখানাগুলোর ও জানালার কাজ ভেঙে গেছে। আশপাশের বিভিন্ন ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী আবুল হেসেন বলেন, যখন বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে তখন তিনি এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলেন। আতঙ্কে তিনি দৌড়াতে থাকেন। প্রথমে ভেবেছিলাম একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটছে। পরে জানতে পারি কারখানার ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটছে। সকালে তাই তিনি ঘটনাস্থল দেখতে এসেছেন কী ঘটেছিল। জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাইনি। কত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে তা জানাতে পারেননি তিনি।

বিকেলে পোশাক কারখানায় কাভার্ড ভ্যান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক-র‌্যালি করেছে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। র‌্যালি থেকে নেতারা নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও  চিকিৎসাসহ বিভিন্ন দাবি জানান।

এদিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সময় কারখানার বাইরে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করা নজরুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এদিকে  সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকা-ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটজনে। সোমবার  ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তারা হলেন সুজন মিয়া (৩৫), নজরুল ইসলাম (৩৫) ও নূর ইসলাম (৪০)।

অন্যদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘটনাস্থলে থাকা একটি লরির ভেতর থেকে একটি, লরির নিচ থেকে তিনটি এবং লরির পাশে আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

আব্বারে আর পাইলাম না : ‘আব্বা ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করত। আগুন লাগার পর আমি দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়া খোঁজাখুঁজি করে শুধু আব্বার ভ্যানটাই পাইছি। তখন আমি ‘আব্বা, আব্বা’ করে কত ডাকলাম! কিন্তু আব্বারে আর পাইলাম না...।’ সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বাবা নজরুল ইসলামকে হারিয়ে এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল তার ১৩ বছর বয়সী ছেলে সামিউল ইসলাম। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। নজরুল ইসলাম (৩৫) মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আবুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় আট বছর আগে পরিবার নিয়ে আশুলিয়ায় এসেছিলেন তিনি। একটি ভ্যানগাড়িতে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন।

সামিউল জানায়, প্রতিদিন বিকেল ৩টার দিকে ভ্যান নিয়ে বের হতেন তার বাবা, বাড়ি ফিরতেন রাত ১০টার দিকে। রবিবার রাতে যখন বিস্ফোরণের খবর আসে, সামিউল ছুটে যায় সেখানে। বাবার ভ্যানটি খুঁজে পেলেও বাবাকে আর পায়নি সে। পরে জানতে পারে, গুরুতর আহত অবস্থায় নজরুলকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন দিশেহারা পুরো পরিবার।