সার পাচার

আরও গভীরে নজর দিতে হবে  

কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এ দেশে কৃষি উৎপাদনের স্বার্থে সার জরুরি অনুষঙ্গ। কিন্তু প্রতি বছরই আমন-বোরো মৌসুমে সার নিয়ে কম-বেশি সংকট কৃষকের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইতিমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, দেশে সার সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২২ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রতিবেশী মিয়ানমারে সার পাচারের বার্তা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার পাচারের বিপরীতে দেশে আসছে ইয়াবা, আইসের মতো মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র। সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাচার করছে সার। অথচ দেশে সারের জন্য সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। সার না পেয়ে কৃষকরা আন্দোলন করছেন। সারের  গুদাম ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েও অনেক এলাকায় সার পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে।

সার সংকট কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি অর্থনীতি ও কৃষকের জীবিকার জন্য চলমান সংকট কৃষি খাতে যে অভিঘাত করছে তা কতটা অকল্যাণকর এ আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রাখে না। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার সার আমদানিতে ভর্তুকি দেওয়ায় প্রতিবেশীদের  তুলনায় দেশে সারের দাম তুলনামূলক কম। এ  সুযোগে অবৈধ মুনাফার লোভে  সার ডিলার ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে পাচারের অপ-প্রক্রিয়া চলমান। ইতিমধ্যে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের অনেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও মূলহোতাদের অস্পর্শিত থাকার বার্তাও মিলেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। কোস্ট গার্ড ও বিজিবির বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত থেকে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। সার পাচারের অভিযোগে কয়েকটি মামলাও করেছে সরকারি সংস্থা দুটি। ডিলাররা নানা কৌশলে কৃষককে বঞ্চিত করে পাচারকারীদের কাছে সার পৌঁছে দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

সার পাচারকারীদের অনেকেই মাদক ও মানব পাচারের সঙ্গেও যুক্ত। কৃষিকার্ডধারী কিছু কৃষকের বিরুদ্ধেও অর্থের লোভে পাচারকারীদের সার সরবরাহ করার অভিযোগ আছে। বেশিরভাগ সার মিয়ানমারে পাচার হলেও পাশাপাশি ভারতেও পাচার হচ্ছে এবং বিজিবি ভারতে পাচারের উদেশ্যে মজুদ করা সার আটকের খবরও সংবাদমাধ্যমেই মিলেছে। সম্পদের বিনিময়ে জীবনবিনাশী মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র সমাজ, অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। দেশের ভর্তুকির সার পাচার হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠছে। চাহিদা মেটাতে আমদানি করা সার পাচারের ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সার পাচারকারীদের পরিধি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সত্ত্বেও ব্যাপ্ত হওয়ায় প্রতীয়মান হয়, তাদের শিকড় অনেক গভীরে। এ অবস্থায় উৎসে নজর আরও গভীরের তাগিদ আমরা দিই। সার বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ডিলারদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েও কেন সুফল মিলছে না, সংগতকারণেই প্রশ্নটি সামনে আসে।

কৃষক যদি ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে পরে খোলাবাজারে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন কিংবা তাও না মিলে, তাহলে শুধু জাতীয় মজুদের হিসাব দিয়ে সংকটের দায় এড়ানো যায় না। সম্প্রতি সারের সংকট নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পেছনে সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা রয়েছেÑ সংশ্লিষ্ট  দায়িত্বশীল কারও কারও এমন মন্তব্য ধোপে টিকে না। সরকার বিপুল অংকের টাকা ভর্তুকি দিয়ে সার আমদানি করছে। কিন্তু সেই সার পাচার হয়ে যাওয়ায় একদিকে রাষ্ট্রের ভর্তুকির উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষকরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। সারের নতুন ও পুরনো সব পাচার রুট বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে এবং পাচারকারীদের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র নীতি অনুসরণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে নিয়মিত বাজার ও গুদাম তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করে কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উৎপাদনে অভিঘাত ঠেকাতে হবে জাতীয় স্বার্থেই।