জ্বালানি তেলে শুধুই লোকসান!

জ্বালানি তেল বিক্রিতে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে এমন দাবিতে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, গত তিন অর্থবছরে ট্যাক্স, ভ্যাট ও ডিউটি বাবদ ৪৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল বিক্রিকে আয়ের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে সরকার। জ্বালানির দাম যত বাড়ে, সরকারের আয়ও তত বাড়ে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকার করেছে, তা বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থ প্রয়োজন। এ জন্য সরকার ভর্তুকি কমাতে চায়, আবার জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে আয়ও কমাতে চায় না। তবে তাদের মতে, সরকারকে অবশ্যই জনগণের স্বস্তির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

বিপিসি সূত্র বলছে, প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের বিক্রয়মূল্যের ওপর গড়ে ২৫ শতাংশ নানা ধরনের কর ও ভ্যাট দিতে হয়। অতি সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি লিটার ডিজেলের বিক্রয়মূল্য ১৩৫ টাকা হলে বিপিসিকে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয় ৩৩ টাকা ৭৫ পয়সা। একইভাবে অকটেনে ৪১ টাকা ২৫ পয়সা, পেট্রোলে ৪০ এবং কেরোসিনে ৩৮ টাকা ৭৫ পয়সা জমা দিতে হবে। বিপিসি আমদানির শুরু থেকে একেবারে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত নানা ধাপে এই অর্থ সরকারকে পরিশোধ করে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিউটি, ভ্যাট এবং ট্যাক্স বাবদ ১৪ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ট্যাক্স বাবদ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এর পরের বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিউটি, ভ্যাট এবং ট্যাক্স বাবদ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্যাক্স বাবদ জমা দেওয়া হয় ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিউটি, ভ্যাট এবং ট্যাক্স ছিল ১৬ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্যাক্স ছিল ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।

বিপিসির কর্মকর্তা জানান, তেল আমদানির শুরুতেই ডিউটি এবং ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। এরপর ট্যাক্সের টাকা মুনাফার ওপর ভিত্তি করে তিন মাস অন্তর পরিশোধ করা হয়।

সূত্র জানায়, ডিজেল আমদানিতে মোট ৩১ দশমিক ৮৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৬ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি)।

অকটেন, পেট্রোল ও বিটুমিনাস খনিজ থেকে উৎপাদিত অন্যান্য পেট্রোলিয়াম তেল আমদানিতে মোট ২৮ দশমিক ১৮ শতাংশ কর প্রযোজ্য। এর মধ্যে রয়েছে ৩ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর।

এদিকে, ফার্নেস অয়েল আমদানিতে মোট ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্যাকেটজাত দুধের দর লিটারে ১০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বাসভাড়া বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনভোগান্তি তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বাড়বে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য না বাড়ানো হলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঝুঁকিতে পড়ত। সরকার অস্বচ্ছল পরিবারকে ফ্যামেলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার যে নির্বাচনী অঙ্গীকার করেছিল, তা পূরণ করা কঠিন হতো বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

তেলের দাম বৃদ্ধির পর বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেছেন, মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিপিসির ২৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে ৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, আমাদের আর ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতার দামের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিপিসির হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তত ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টন জ্বালানি বিক্রি করে বিপিসি। এর মধ্যে ওই অর্থবছরে ডিজেল বিক্রি করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। দেশের পরিবহন খাতের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। শুধু স্থলভাগের সড়ক ও রেলওয়ে যোগাযোগ নয়, দেশের অভ্যন্তরে মালামাল পরিবহনে নৌপথের পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। এ ছাড়া কৃষি সেচের একটি অংশ এখনো ডিজেল ব্যবহার করে। কাজেই শুধু উৎপাদিত পণ্যের পরিবহন নয়, কৃষি উৎপাদন খরচও বাড়বে। এতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার দুই রকমের সমস্যায় পড়েছে। সে ভর্তুকিও কমাতে চায়, আবার কর আদায়েও কোনো ছাড় দিতে চায় না। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রয়োজন ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সরকারের আয় নেই, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। জ্বালানি তেল হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের একটি বড় উৎস। এখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে বেতন দেওয়া হবে। একজনের ব্যয় মেটানোর জন্য আরেকজনের ওপর বোঝা চাপানো এক ধরনের বৈষম্য বলে মনে করেন তিনি।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, জনগণের ওপর বোঝা চাপানোর যে প্রক্রিয়া সরকার শুরু করেছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, জনগণ যাতে স্বস্তি পায়, সেই দিকটি মাথায় রাখা উচিত ছিল।