এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার তদন্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। থানা-পুলিশের অধীনে রিমান্ড মঞ্জুর হলেও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওইদিন সোমবার রাতেই মামলা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান। এ বিষয়ে ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে নেওয়া হয়। নজরুলকে ডিবিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর মাকসুদাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার রাত ১টার দিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের গাবুরা পশ্চিমপাড়া সরদারবাড়ি জামে মসজিদের পাশে মরিয়মের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গাবুরা সরদার পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রাত প্রায় ১১টার দিকে মরিয়মের মরদেহ গ্রামে পৌঁছায়। দাফনের আগে স্বজনরা মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
রিমান্ড শেষে কারাগারে মাকসুদা : একদিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদাকে। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন এ আদেশ দেন। আদালত সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার রিমান্ড শেষে আসামিকে আদালতে হাজির করে কারাগারে রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি মামলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য তদন্তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
মরিয়মকে নির্যাতন করা হতো : লাশ উদ্ধারের পর গত রবিবার রাতেই এমপি গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা এবং নিজ শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেন মরিয়মের বাবা। মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে নজরুল ও মাকসুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে নজরুল ও মাকসুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তাদের ফোন করে জানাতেন। মামলার তদন্ত বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘কিছু ক্লু পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে বলা যাচ্ছে না। রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে মরিয়মের মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি।’
নজরুলের এমপি পদ নিয়ে যা বললেন স্পিকার : এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, তা দেখে তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় সংসদ। আরেকটি হতে পারে, আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না বলেও জানান তিনি। ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় দলটি। তবে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ এখনো আছে। এর মধ্যে তার স্ত্রী মরিয়মের মৃত্যু নতুন করে গাজী নজরুলকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
নজরুলের এমপি পদ নিয়ে টিআইবি উদ্বেগ : এতকিছুর পরও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। গাজী নজরুলের স্ত্রী মরিয়মের মৃত্যু ও তার আগে ‘যৌন ব্ল্যাকমেইলের’ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি বলেছে, জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ ও অন্যান্য সংসদ সদস্যের জন্য মর্যাদাহানিকর অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ অব্যাহত থাকবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে এমন ধারাবাহিক গুরুতর অভিযোগ ও নৈতিক প্রশ্ন জাতীয় সংসদের মর্যাদার জন্য অবমাননাকর এবং সংসদ সদস্যদের জন্য চরম লজ্জাজনক। ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত; কিন্তু সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই তার সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট করতে হবে।