বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে নানা উপায়ে হত্যার শিকার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।
গতকাল মঙ্গলবার কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা অপ্রতিমের বাসায় পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে গেলে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে বিভিন্ন আইডি থেকে ব্লেইম করা হচ্ছে। আমার ছেলে কিছু বোঝে? আমার দুধের শিশুকে অপরাধী বানাতে চাইলে আমি এটা কখনোই মেনে নেব না। আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বিচার চাই না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত শিশুর জীবন নেবে, কত পরিবারের জীবন ধ্বংস করবে সেটি নিয়েও আমি চিন্তিত। আমি চাই, এ হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।’
তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে আমি অনেক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। ওই ঘটনার কারণে যদি আমার ছেলেকে টার্গেট করা হয়ে থাকে, তাহলে এটা আমি মেনে নেব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তার শাস্তি আমি পাব। আমার ছেলে কেন এর শাস্তি পাবে? আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলা হলো? আমার ছেলেকে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেও তাদেরই একজন। অথচ আমার ছেলে নিষ্পাপ, ছোট বাচ্চা। সে এসবের কিছুই বোঝে না।’
এ সময় কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) অ্যাডভোকেট তারেক আবদুল্লাহ, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল হক খন্দকার এবং সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শরীফুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
হত্যার বিচারের দাবিতে মৌন মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণ : বিশ^বিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, কুবি বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার বিচার ও চার দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে মৌন মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ফ্যাকাল্টির সামনে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে সেখান থেকে মৌন মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বর হয়ে আইন অনুষদ প্রদক্ষিণ করে ফের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে এসে শেষ হয়।
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে অপ্রতিম হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন ও ফাঁসির রায় কার্যকর করা; কুমিল্লার পুলিশ সুপার, আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব স্বীকার করে প্রত্যাহার করা; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া; এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক রেসপন্স ইউনিট গঠন করা।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাব্বানী বলেন, ‘আমরা প্রথম দিন থেকেই পুলিশের উদাসীনতা দেখতে পাচ্ছি। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে হত্যা করা হলো, আসামিদের ধরা হলো; কিন্তু এখনো বিচার নিশ্চিত হয়নি। আসামিদের বয়স নিয়ে একটি চক্রান্ত করা হচ্ছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে সঠিক বয়স নির্ধারণ করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।’
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূঁইয়া বলেন, ‘অপ্রতিমের অপহরণ ও নির্মম হত্যাকা-ের পর থেকেই আমরা রাজপথে আছি। মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছি। চার দফা দাবি জানালেও প্রশাসনের উচ্চমহল থেকে কোনো সাড়া পাইনি। আজকের মৌন মিছিলের মাধ্যমে জানাতে চাই, আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাইনি। চার দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে।’
এর আগে সোমবার একই দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। তার আগের দিন রবিবার চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন তারা।