রাজধানীর বংশালের বাসিন্দা মো. রায়হান উদ্দিন (৩৫) সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ভিডিও দেখে ককটেল তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে নিজ বাসায় তৈরি করেন। তৈরিকৃত ককটেল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার নির্দেশে গত ১৭ তারিখ যাত্রাবাড়ী থানা কম্পাউন্ড ও প্রধান ফটকে বিস্ফোরণ ঘটান। রায়হান উদ্দিন বংশাল থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিট আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক। ঘটনার তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকেসহ আরও তিনজনকে চারটি ককটেলসহ গ্রেপ্তার করে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান ককটেল তৈরির প্রক্রিয়া এবং তৈরির কারণ সম্পর্কে জানান।
ডিবি ওয়ারী বিভাগের ডিসি মোল্লা মো. শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়হান উদ্দিন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ককটেল তৈরির কৌশল রপ্ত করে একাধিক ককটেল তৈরি করেন। ভারতীয় একটি নাম্বার থেকে তার রাজনৈতিক গুরু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেন ককটেল মারার নির্দেশ দেন। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্যই ককটেল তৈরি এবং নিক্ষেপ করেছিলেন তিনি। রায়হান সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ৫ মাস কারাগারে ছিলেন।’
হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সহিংসতা ঘটানোর অন্যতম বড় উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিস্ফোরক দ্রব্য, যা ককটেল নামে পরিচিত। গত কিছুদিন থেকে রাজধানীতে ধারাবাহিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষ আহত হচ্ছেন, জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অতীতে এই ককটেল কত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, কত সংসারের জীবিকার প্রধান ব্যক্তিকে পঙ্গু করে পরিবারটিকে পথে বসিয়েছে, এ পরিসংখ্যান কম বড় নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে সেগুলোর ধ্বংস ক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি। ককটেল কোথায় পাওয়া যায়, কারা কী কারণে এবং কীভাবে তৈরি করছে, তা খুঁজতে গিয়ে একাধিক চক্রের তথ্য সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিতে ককটেল তৈরি করছে একাধিক চক্র। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ডেমরার সাইনবোর্ড, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও শরীয়তপুরের জাজিরায় গড়ে উঠেছে এসব আস্তানা। দক্ষ কারিগরের পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তায় এখন বাসাবাড়িতেও তৈরি হচ্ছে ককটেল। পরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নির্দেশে তৈরি এসব ককটেল কয়েক হাত ঘুরে পৌঁছায় নিক্ষেপকারীদের হাতে। টাকা ও দলীয় পদ-পদবির আশায় কর্মী এবং ভাড়াটে তরুণরা এসব ককটেল নিক্ষেপ করছে। আগে ১০০-২০০ টাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হলেও এখন দিতে হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। জনসমাগমপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বা যেখানে বিস্ফোরণ ঘটালে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হবে সেখানে নিক্ষেপের জন্য পারিশ্রমিক আরও বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা ককটেল নিক্ষেপ করছে, আমরা তাদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ককটেল যারা তৈরি করছে, তাদের সন্ধানেও অভিযান চলছে। তাছাড়া রাজধানীর যেসব এলাকায় বিভিন্ন সময় ককটেল তৈরি করা হতো, সেসব বাসা-আস্তানা নজরদারিতে রয়েছে। আমাদের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে।’
ডিবির তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে শুধু রাজধানীতেই ককটেলের ব্যবহার বেড়েছে পাঁচগুণেরও বেশি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ককটেল তৈরি করাচ্ছে। যারা আর্থিক জোগানদাতা, তাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী ককটেল বা বোমা তৈরি করে মাঠ পর্যায়ের কর্মিবাহিনীর হাতে এগুলো তুলে দেন মধ্যম সারির নেতারা।
নেতার ইচ্ছায় কর্ম: রাজনৈতিক দলের কর্মিবাহিনী এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভাড়াটে লোক দিয়ে রাজপথে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিগত কয়েক মাসের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য পেয়েছে। ককটেলসহ পুলিশ একাধিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ১১ তারিখে গুলশানে ঝটিকা মিছিল থেকে পাঁচটি ককটেলসহ আব্দুর রহিম ও আরাফাত নামে দলটির দুজন কর্মীকে আটক করে পুলিশ। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের দিকেও ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। হাতেনাতে ধরা আব্দুর রহিম পুলিশকে জানিয়েছে, ‘আমাদের নেতারা ককটেল দিছিল। তাদের নির্দেশে ককটেল ফাটাচ্ছি।’
গত ১৯ তারিখে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক ও রেলওয়ের ইলেকট্রিশিয়ান সাখাওয়াত হোসেন রায়হান এবং যুবলীগ কর্মী মোহাম্মদ সানমুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদের দাবি, আওয়ামী লীগের ডাকা ‘লকডাউন’ সফল করা, নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া ও জনমনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে দুজনে ককটেল নিক্ষেপ করেছিল। একাধিক হাত ঘুরে ককটেলগুলো তাদের হাতে পৌঁছানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে জড়িত মো. সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফ (২৩) নামে ছাত্রলীগ নেতাকে সোমবার চারটি ককটেলসহ গ্রেপ্তার করেছে ডিবি রমনা বিভাগ। ডিবি রমনা বিভাগ জানিয়েছে, মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মিরাজ ১০ হাজার টাকা ও দলীয় পদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সালমানকে ককটেল নিক্ষেপে প্ররোচিত করেন।
সম্প্রতি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত অনেককে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে অধিকাংশই পুলিশকে জানিয়েছে, প্রতি ককটেল নিক্ষেপের জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে ১০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। আবার একনিষ্ঠ কর্মীদের নতুন কমিটি গঠন হলে প্রত্যাশিত পদ দেওয়ার প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে। ককটেল নিক্ষেপকারীদের সমন্বয় করার জন্য দেশে অবস্থানকারী আলাদা গ্রুপ কাজ করছে। বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠালেই মিলছে টাকা। বেশি টাকা পেতে একই স্পটে ৪-৫টি ককটেলও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বাসে অগ্নিসংযোগে মাদকাসক্ত ও টোকাইদের টার্গেট করা হচ্ছে। ককটেল নিক্ষেপে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। গ্রেপ্তারকৃতদের ফোনে বিভিন্ন ভারতীয় নাম্বার পাওয়া গেছে। ওই নাম্বারগুলোর তথ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীদের শীর্ষ নেতাদের নাম আসছে। যারা আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন।
ককটেল-বোমার কারখানা এখন রাজধানীর বুকে : পুলিশি হয়রানি ও নজর এড়াতে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ককটেল তৈরির কারখানা এখন খোদ রাজধানীতেই গড়ে উঠেছে। আবাসিক এলাকা কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ও সন্দেহের বাইরে, এমন ফ্ল্যাট ও বাড়ি ককটেল তৈরির উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়ে থাকে।
যাত্রাবাড়ী থানায় ককটেল বিস্ফোরণে গ্রেপ্তার রায়হান উদ্দিন নিজ বাসায়ই ককটেল বিস্ফোরণের কথা জানিয়েছেন পুলিশকে। গত ৭ জুলাই মিরপুর সি-ব্লকের একটি বাসা থেকে ২০টি ককটেল ও পেট্রোল বোমাসহ মো. সামি (২০) নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। পল্লবী থানার ওসি হাসান বশির জানিয়েছেন, ওই বাসায় ককটেল ও পেট্রোল বোমা তৈরি করা হচ্ছে, এমন খবরে অভিযান চালিয়ে সামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থলে আরও ৪০/৪৫ জন ছিলেন। তারা পালিয়ে যান।
গত বছরের ১৪ নভেম্বর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে ককটেল তৈরির কারখানা থেকে ৩৫টি ককটেল ও ককটেল তৈরির সরঞ্জামাদি উদ্ধার করে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, জেনেভা ক্যাম্পে ককটেল তৈরির একাধিক আস্তানা রয়েছে। অর্ডার দিলেই চক্রটি ককটেল তৈরি করে দেয়। আবার তৈরিকৃত ককটেল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। ককটেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের দক্ষ কারিগররা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে ককটেলের পুরনো ২০-২২ কারিগরের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নিতে শুরু করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রয়েছে দাগি রুবেল, পা-ু হিরা, মুক্তা রুবেল, পোপলা মুন্না, ফারুক ওরফে হিরোঞ্চি ফারুক, এলেক্স সাজ্জাদ, পার মনু ও শাহআলম। এছাড়া গত শুক্র ও শনিবার যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও ও মহাখালীতে বিস্ফোরণ ঘটানো ককটেলগুলো সাইনবোর্ড এলাকার একটি কারখানায় তৈরি বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে বোমা তৈরির মূল কারিগর ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী মো. ফিরোজ খান (৫০) এবং তার স্ত্রী লাভলী আক্তারকে (৪০) আটটি ককটেল, ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামাদিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১১ আগস্ট সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের একটি বাসা থেকে ৯টি পাইপ বোমা, গান পাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামাদিসহ মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামে জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি’র এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। জেএমবির সদস্য বোমা তৈরিতে দক্ষ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুনের তত্ত্বাবধানে ওই আস্তানায় শক্তিশালী বোমা তৈরি করছিল তারা।
গ্রেপ্তার হওয়াদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একটি মাঝারি মাত্রার ককটেল তৈরিতে আগে খরচ পড়ত ৩০০-৪০০ টাকা, বর্তমানে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটি দাঁড়িয়েছে ৬০০-৭০০ টাকায়। বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর ওয়েবসাইট থেকে বোমা তৈরির কলাকৌশল রপ্ত করছে বোমা-কারিগররা।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী টিমের এক এডিসি বলেন, আগে জর্দার কৌটায় শুধু বারুদ দিয়ে ককটেল তৈরি করা হতো। এই ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে শুধু বিকট শব্দ হতো। হতাহতের ঘটনা ঘটত না। এরপর গানপাউডার, লফার বা গন্ধক দিয়ে ককটেল তৈরি হতো। সেগুলোও অনেকটা ভীতি ছড়াতে ব্যবহার হতো। বর্তমানে লোহা, পেরেক বা ছোট ছোট তারকাঁটা, সাইকেলের বল, কাচের টুকরা, স্প্রিন্টার ও পাথরের গুঁড়ার মতো উপকরণ থাকায় এখনকার ককটেলগুলো প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অনেক বেশি। তিনি বলেন, ঢাকা ছাড়াও শরীয়তপুরের জাজিরায় ব্যাপক ককটেল তৈরি করা হয়। ওই এলাকায় গ্রামবাসী বা কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। হাত বাড়ালেই উপকরণ পাওয়া যায়। ফলে যে যার মতো করে ককটেল বানাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করছে।