অফিস ফাঁকি দিয়ে শিক্ষকতা করেন আবহাওয়া কর্মকর্তা

সরকারি চাকরি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অফিস ফাঁকি দিয়ে স্কুলে শিক্ষকতা করছেন কক্সবাজারের টেকনাফের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের উচ্চ পর্যবেক্ষক ( সহকারী  আবহাওয়াবিদ) খন্দকার শফিউল আলম। অভিযোগ রয়েছে, আবহাওয়া অফিসের হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর করলেও প্রায় এক যুগ ধরে তিনি টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শফিউল বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে টেকনাফ আবহাওয়া অফিসে যোগ দেন শফিউল আলম। বছর দুয়েক নিয়মিত অফিস করলেও ২০১৪ সাল থেকে তিনি টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আবহাওয়া অফিসের হাজিরা খাতায় সই করেই তিনি ছুটে যান স্কুলে। স্কুল ছুটির পর বিকেলে তিনি অফিসে আসেন।

জানা গেছে, শফিউল কখনো নিজ নামে, কখনো অন্যের নামে, কখনো বা স্ত্রীর নামে ওই বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যলয়ে ক্লাস  নেওয়া দুই মাসের জন্য বন্ধ রেখে পরিচয় গোপন করে যোগ দেন  সাবরাং উচ্চ বিদ্যালয়ে। বর্তমানে আবার তিনি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন স্ত্রী হোমাইরা আক্তারের নাম ব্যবহার করে। স্কুলের হাজিরা খাতায় স্ত্রীর নামেই স্বাক্ষর করছেন।

কয়েক দিন আগে বেলা ১১টার দিকে টেকনাফ আবহাওয়া অফিসে সরেজমিন দেখা যায়, প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। ভেতরের চত্বরে ঘাস গজিয়েছে। টিলার মাটি নিয়ে গেছে লোকজন, আবহাওয়া অফিসের পেছনের দেয়ালঘেঁষে বসে মাদক সেবন করছে চার যুবক। এ ছাড়া অফিসের ভেতরে দামি ও সংবেদনশীল আবহাওয়া পরিমাপক যন্ত্রগুলো ধুলোবালির আস্তরণে ঢেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু অফিসে নেই শফিউল আলমসহ তার দুই অধীনস্ত কেউ।

এরপর ফের আরেক দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ প্রতিবেদক আবহাওয়া অফিসে গেলে এক বেলুন মেকার জানান, ‘স্যার বাইরে গেছেন, তবে কোথায় গেছেন জানি না।’ এরপর সেখান থেকে টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে  গিয়ে দেখা যায় শফিউল আলম ৭ম শ্রেণির ‘ঘ’ শাখার গণিত ক্লাস নিচ্ছেন। এরপর নবম ও দশম শ্রেণির আরও কয়েকটি ক্লাস নেন।

ওই বিদ্যালয়ের এসএসসি ২০১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি আমাদের সময়ও ক্লাস নিয়েছেন। তখন আমরা জানতাম না তিনি সহকারী আবহাওয়াবিদ।’

দীর্ঘদিন ধরে ওই স্কুলে শিক্ষকতা করেন এমন একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, শফিউল আলম দীর্ঘদিন ধরে এই স্কুলে চাকরি করছেন। এখন তিনি তার স্ত্রীর হুমাইয়ার নাম দিয়ে চাকরি করছেন।

তারা আরও জানান, শফিউল আলম শুধু মাসিক বেতন-ভাতা নেন। কিন্তু স্কুলে হওয়া বিশেষ ক্লাসের জন্য টাকা নেন না। যার পরিমাণ প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা। ওটা সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক ভাগ-বাটোযারা করে নেন। তাই তারা দুজন শফিউলকে অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে।

টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক তাহমিনা আঁখি বলেন, সরকারি চাকরিজীবী শফিউল আমাদের বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক। আমি তার বদলে অন্য কাউকে স্কুলে নিয়োগ দিতে বলেছিলাম। কিন্তু স্কুল সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক শফিউলের পক্ষে থাকায় আমিসহ অন্য শিক্ষকরা অসহায় হয়ে পড়েছি। এ কারণে আমি অন্যত্র বদলির আবেদন করেছি।’

তিনি আরও বলেন, শফিউল নানা সময় নানাজনের পরিচয়ে এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। একসময় আবদুর রহমান নাম দিয়েও চাকরি করেছেন।

সাবরাং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আনিস বলেন, পরিচয় গোপন করে শফিউল আলম আমাদের স্কুলে চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি জুন মাস থেকে জুলাই মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত আমাদের স্কুলে ক্লাস নিয়েছেন। পরে যখন আমরা জানতে পেরেছি, তিনি টেকনাফ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের উচ্চ পর্যবেক্ষক, তখন আমরা তাকে অব্যাহতি দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, শফিউল আলম এখন আবার তার আগের টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষকতা করেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার শফিউল আলম বলেন, ‘আমি কোনো স্কুলে ক্লাস নেই না। এটা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।’ আপনাকে দিনের বেলা অফিসে পাওয়া যায় না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সিডিউল ভাগ করে কাজ করি। সাধারণত আমার ডিউটি দুপুর ২টার আগে থাকে না। তাই আমাকে ওই সময়ে অফিসে পাওয়া যায় না।’ 

টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর হোসাইন বলেন, ‘শফিউল আলম আমাদের বিদ্যালয়ের জলবায়ুসংক্রান্ত বিশেষ ক্লাস নেন। মাঝেমধ্যে কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে একাডেমিক ক্লাসও নেন।’

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জাহেদ মাহমুদ বলেন, শফিউল আলম আমাদের বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক নন এবং তিনি এখানে কোনো ধরনের পূর্ণকালীন চাকরি করেন না। তিনি সরকারি আবহাওয়া অফিসের দায়িত্বশীল পদে আছেন, তাই আমাদের বিদ্যালয়ে তার চাকরি করার প্রশ্নই আসে না। বিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ‘শিক্ষক গ্রুপে’ শফিউলের নাম থাকার বিষয়টি জানালে সুর নরম করে জাহেদ মাহমুদ বলেন, ‘আসলে বিষয়টি তেমন নয়, যেভাবে ভাবা হচ্ছে। তিনি আমাদের নিয়মিত শিক্ষক নন ঠিকই, তবে একজন আবহাওয়া কর্মকর্তা এবং বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি হিসেবে বিশেষ কিছু ক্লাস নেন।’

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থেকে অন্য কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা শিক্ষকতা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ পাঠানো হবে।’