মাহফুজ রাসেলের জীবন প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ম্যানচেস্টারে ভালো বেতনের করপোরেট চাকরি করেও তিনি ২০১৬ সালে সব ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। শহরের ব্যস্ত জীবন ছেড়ে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নেওয়ার এই সিদ্ধান্তই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্রথমে তিনি মাত্র পাঁচ একর পাহাড়ি জমি কিনেছিলেন। ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগ বিস্তৃত হয়ে ৭৫ একরের এক প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বনে পরিণত হয়। এই বনের নাম দেওয়া হয় ‘পিটাছড়া’। রাসেলের সংরক্ষণ দর্শনের মূল কথা হলো ‘No Intervention’, প্রকৃতিকে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে দেওয়া। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, প্রকৃতি নিজেকে পুনর্গঠন করতে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। তাই দেশীয় গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার ওপরই তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন।
পিটাছড়া আজ বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে এশিয়ান ইয়েলো পন্ড টার্টল, পাহাড়ি ঝরনার কচ্ছপ, বার্মিজ পাইথন, চশমাপরা হনুমান, বনবিড়াল, বনরুই, শজারুসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, পাখি ও ব্যাঙ। রাসেলের মতে, পাহাড়ি ঝরনা শুকিয়ে গেলে বন্যপ্রাণীরাও টিকে থাকতে পারবে না। সে কারণে বন সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ রক্ষা করাও তার উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
শুধু বন রক্ষা করলেই হবে না, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নও জরুরি। এই উপলব্ধি থেকে তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা, মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ ও জৈব কৃষি কর্মসূচি চালু করেছেন। এর ফলে স্থানীয় মানুষের বনের ওপর নির্ভরশীলতা ও শিকারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মাহফুজ রাসেলের এই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা জাতীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের National Tree Plantation Award 2025-Gi Research, Conservation and Innovation (Category-Cha) বিভাগে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন।
একজন করপোরেট নির্বাহী থেকে বন সংরক্ষক, মাহফুজ রাসেলের যাত্রা প্রমাণ করে, একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা কীভাবে একটি পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। পিটাছড়া আজ শুধু একটি বন নয়, এটি মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ।
তার শৈশব কেটেছে পটুয়াখালী ও ঢাকায়। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় পটুয়াখালী জুবিলী স্কুলে। পরবর্তী সময়ে তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল ও চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাস করেন।
১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেন। এরপর BIFT থেকে মার্চেন্ডাইজিংয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করে প্রায় দুই বছর একটি বায়িং হাউজে কাজ করেন। ২০০২ সালে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং Manchester Metropolitan University থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।