সাফল্য মানে প্রকৃতির ক্ষতি না করে বেঁচে থাকা

প্রশ্ন : আপনি ম্যানচেস্টারে যখন থাকতেন তখন বায়িং হাউজে ভালো একটা চাকরি করতেন। কিন্ত‘ তাও সব ছেড়ে দিয়ে আপনি বাংলাদেশ চলে এসেছেন। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপনাকে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল? কখনো কি আবার লন্ডন ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আমি ছোটবেলায় একটি ছোট মফস্বল শহরে কয়েক বছর কাটিয়েছি, যেখানে প্রকৃতি ছিল খুবই নিবিড়। সেই প্রকৃতির মধ্যেই অনেকটা সময় কাটত, তাই প্রকৃতির প্রতি টানটা আমার শৈশব থেকেই তৈরি হয়েছে। ম্যানচেস্টারে বায়িং ম্যানেজার হিসেবে ভালো অবস্থানে ছিলাম, ডিরেক্টর হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল, তখন হয়তো সেটাকেই সফলতা মনে হতো। কিন্তু পরে বুঝেছি, চাকরি বা পদমর্যাদা আমার জীবনের প্রকৃত সফলতা নয়। ২০০৮-০৯ সালে চাকরি ছাড়ার পর বিভিন্ন দেশ ও মানুষের কাছ থেকে আত্মনির্ভর ও টেকসই জীবনযাপন সম্পর্কে শিখেছি।

বাবার মৃত্যুর পর মায়ের কাছাকাছি থাকার জন্যই মূলত দেশে ফিরে আসি। এখন প্রকৃতির মথ্যে থাকতে পারা, প্রকৃতির জন্য কাজ করা, মানুষকে এর গুরুত্ব বোঝানো এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ফিরিয়ে আনাই আমার কাছে সফলতা মনে হয়। অবশ্য নানা বাধা, মানুষের উদাসীনতা, এমনকি হামলার শিকার হওয়ার পর হতাশ হয়ে ম্যানচেস্টারে ফিরে যাওয়ার কথাও মাথায় এসেছে। কিন্তু পিটাছড়া বন তৈরির ফলে বন্যপ্রাণীর ফিরে আসা এবং স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়তে দেখে আবার আশার আলো পেয়েছি। তখন মনে হয়েছে কঠিন হলেও এটাই আমার প্রয়োজনীয় জীবন, এখানেই আমার থাকা দরকার।

প্রশ্ন : আপনি বলেন, প্রকৃতি নিজেই জানে কীভাবে নিজেকে সারিয়ে তুলতে হয়। তো এখানে তো বেশ কয়েক বছর আছেন, ৭/৮ বছরের মতো, কী দেখলেন, প্রকৃতি কি নিজে থেকেই সেরে উঠছে? এর বাইরেও আর কী কী জানতে পারলেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : এখানে থাকতে থাকতে আমি বুঝেছি, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে প্রকৃতিকে বুঝতে হয়। আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র নই, তাই ফিল্ডওয়ার্ক, নিয়মিত পড়াশোনা, বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়া এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করি। একটি বনের গাছপালা, মাটি, পানি, ছত্রাক, পোকামাকড় ও বন্যপ্রাণী, সবকিছু কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত, সেটা খুব মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।

ইকোসিস্টেমটা যত বুঝতে শিখছি, ততই বুঝতে পারছি কোথায় আমাদের কাজ করা দরকার, আর কোথায় প্রকৃতিকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে। তাই আমি প্রায়ই বলি, ‘No intervention is the best intervention’ অনেক সময় কোনো হস্তক্ষেপ না করাই সবচেয়ে ভালো হস্তক্ষেপ। আমরা আগুন, শিকার বা বন ধ্বংসের মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো বন্ধ করার চেষ্টা করি; এরপর প্রকৃতি নিজের নিয়মেই নিজেকে সারিয়ে তোলে। প্রকৃতির কাছ থেকে আমি প্রতিদিনই শিখছি, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে নেই, কখনো কখনো শুধু ধৈর্য ধরে তাকে সময় ও সুযোগ দিতে হয়।

প্রশ্ন : এই বনের কোনো প্রাণী বা পাখি কি আপনার কাছে বিশেষ মনে হয় যেটা আপনার কাছে অনেক পছন্দের?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আসলে একটি প্রাণীকে আলাদা করে সবচেয়ে বিশেষ বলা আমার জন্য একটু কঠিন, এই বনের প্রত্যেকটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা আছে। তারপরও বেঙ্গল স্লো লরিস বা লজ্জাবতী বানর এবং ওয়েস্টার্ন হুডেড পিটা (খয়রা মাথা শুমচা) আর রেড হেডেড ট্রোগন (লাল মাথা কুচকুচি) পাখির প্রতি আমার আলাদা একটা দুর্বলতা আছে। খুব শান্ত, লাজুক ও নিশাচর এই স্লো লরিস এখন বিপন্ন; আবাসস্থল ধ্বংস আর মানুষের নানা ভুল ধারণার কারণে এটি হুমকির মধ্যে আছে। পিটাছড়ায় যখন প্রথম স্লো লরিসের উপস্থিতি দেখি, তখন মনে হয়েছিল বনটি ধীরে ধীরে আবার তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাচ্ছে। ওদের নিরাপদ আবাস তৈরি, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করতে গিয়ে প্রাণীটির সঙ্গে একধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। স্লো লরিসের উপস্থিতি আমাকে মনে করিয়ে দেয় বনকে একটু সময় ও নিরাপত্তা দিলে প্রকৃতি আবার প্রাণ ফিরে পায়।

প্রশ্ন : যখন একা একা বনের ভেতর হাঁটেন, তখন সাধারণত কী নিয়ে ভাবেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : বনের ভেতর একা হাঁটার সময় আসলে অনেক কিছু ভাবি, আবার কখনো কিছুই ভাবি না, শুধু চারপাশটা দেখি আর শুনি। কোন পাখি ডাকছে, নতুন কোনো গাছ উঠছে কি না, ঝিরিতে পানি কেমন আছে কিংবা বন্যপ্রাণীর কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে কি না। এসব খেয়াল করি। কখনো ভাবি, এই বনটা আরও নিরাপদ হলে কত প্রাণী এখানে ফিরে আসতে পারবে। আবার বন ধ্বংস, শিকার বা আশপাশের মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়েও চিন্তা হয়। অনেক নতুন পরিকল্পনা ও কাজের ধারণাও এই একা হাঁটার সময়ই মাথায় আসে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, বনের নীরবতার মধ্যে থাকলে নিজের ভেতরটাও শান্ত হয়ে আসে। মনে হয়, জীবনকে আসলে খুব বেশি জটিল করে দেখার প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন : অনেক স্থানীয় মানুষ এখনো বনকে ‘অকেজো’ বা কোনো কাজের নয় বলে মনে করেন। চারপাশের এসব মানুষ যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেয় না, তখন আপনি কীভাবে তাদের বোঝান? এ ব্যাপারে কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আমি তাদের দোষ দিই না। অনেক মানুষের কাছে বন মানে এমন জমি, যেখান থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আয় আসে না। জীবিকার চাপে তাই কেউ বন কেটে চাষ করেন, আবার কেউ গাছপালা কেটে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করেন। শুধু ‘বন বাঁচান’ বললে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা পাড়ায় পাড়ায় পোস্টারিং করেন, মানুষের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেন, এমনকি শিকারিদের বাড়িতেও গিয়ে শিকারের ক্ষতি বোঝানোর চেষ্টা করেন। পিটাছড়া পাঠাগারের মাধ্যমে শিশুদের ইকোসিস্টেম সম্পর্কে শেখাচ্ছি, যাতে একদিন তারাই বন ও প্রকৃতির রক্ষক হয়; তাদের মাধ্যমে মা-বাবাদের মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। আমরা ছোট পরিসরে বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ দিই, আর বড় উদ্যোগের জন্য সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনাও দিয়েছি। এই সচেতনতা, স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ততা এবং পুরো এলাকায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে দেখেই আমি মনোবল পাই। তখন মনে হয়, পথটা কঠিন হলেও আমরা ঠিক দিকেই এগোচ্ছি।

প্রশ্ন : পত্রিকায় পড়েছি আপনি স্থানীয়দের থেকে সন্দেহ, বাধা এবং এমনকি শারীরিক আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন। এই অবস্থায় আপনি আপনার মনোবল কীভাবে ধরে রাখেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : কাজটা আসলে অনেক কঠিন। কয়েকটি বড় কোম্পানির কাঁচামালের জন্য কাসাভা চাষ করতে গিয়ে হাজার হাজার একর পাহাড়ি বন উজাড় হচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে টানা তিন-চার বছর কথা বলার পর গত বছর থেকে এই চাষ প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধ হয়েছে। এটা আমাদের বড় একটি সাফল্য। আবার শিকার বন্ধ করতে গিয়ে কয়েকশ মানুষের সংঘবদ্ধ বাধার মুখেও পড়েছি; আমাকে এবং আমাদের কেয়ারটেকারকেও মারধর করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মন ভাঙে, প্রচণ্ড হতাশা আসে এবং মানসিক চাপও তৈরি হয়, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু তখন আবার মনে হয়, কাউকে না কাউকে তো এই দায়িত্ব নিতেই হবে। আমরা চুপ থাকলে একের পর এক বন হারিয়ে যাবে, আর বন্যপ্রাণীগুলোও তাদের শেষ আশ্রয়টুকু হারাবে। কিছু পরিবর্তন অন্তত আনতে পেরেছি, যদিও এখনো অনেক কাজ বাকি এবং যেতে হবে অনেক দূর। আমার আশা, পিটাছড়াকে দেখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও মানুষ এমন উদ্যোগ নেবেন। এই বিশ্বাসটাই আমাকে আবার উঠে দাঁড়ানোর এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।

প্রশ্ন : বন রক্ষা করা এবং এখানকার মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম এর মধ্যে আপনি কীভাবে ভারসাম্য রাখেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আমি বন আর মানুষের জীবনকে আলাদা করে দেখি না। একজন মানুষ যদি পরিবারের খাবার, চিকিৎসা বা সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাকে শুধু বন রক্ষা করতে বললে সেটা বাস্তবসম্মত হবে না। তাই পিটাছড়ায় বন সংরক্ষণের পাশাপাশি বিনামূল্যের চিকিৎসাকেন্দ্র, পাঠাগার, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছি। নারীদের সেলাই, মাশরুম চাষ, হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সামর্থ্য সীমিত, তাই এখন কাজগুলো ছোট পরিসরে করতে হচ্ছে। সরকার, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো সহযোগিতা করলে আরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব। মানুষ যেন বন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি না করেও সম্মানের সঙ্গে আয় করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাই তৈরি করতে চাই। আমার কাছে ভারসাম্য মানে মানুষকে বন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং মানুষ ভালো থাকবে বলেই বনও ভালো থাকবে।

প্রশ্ন : আজকের এই পুঁজি ব্যবস্থায় সফলতা আসলে কী বলে মনে করেন? পুরনো করপোরেট জীবনটাকে আপনি সফল হিসেবেন দেখেন নাকি এখন আপনি নিজেকে সফল বলে মনে করেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আজকের পুঁজিনির্ভর সমাজে সাফল্য বলতে সাধারণত বড় চাকরি, বেশি আয়, বাড়ি-গাড়ি ও সামাজিক অবস্থানকে বোঝানো হয়। ম্যানচেস্টারে বায়িং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সময় আমিও হয়তো সাফল্যকে সেভাবেই দেখতাম। কিন্তু পরে বুঝেছি, আয় ও পদমর্যাদা বাড়লেও মানুষের চাহিদা শেষ হয় না; বরং আমরা আরও বেশি ভোগ ও অপচয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ি। এখন আমার কাছে সাফল্য মানে নিজের প্রয়োজন সীমিত রাখা, যতটা সম্ভব আত্মনির্ভর হওয়া এবং প্রকৃতির ক্ষতি না করে বেঁচে থাকা। একটি উজাড় জায়গায় বন ফিরে আসা, বন্যপ্রাণী নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া কিংবা একজন মানুষের জীবন একটু ভালো হওয়া এসবই এখন আমার কাছে সাফল্য। করপোরেট জীবনে সফলতা ছিল আমি কতটা অর্জন করছি; আর এখন সফলতা হলো, আমি প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কতটা কাজে লাগতে পারছি।

প্রশ্ন : ধরেন কাল যদি কেউ এসে আপনাকে বলে, আমি সব ছেড়ে দিয়ে প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য নিজের ক্যারিয়ারকে উৎসর্গ করতে চাই, আপনি তাকে কী উপদেশ দেবেন?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আমি প্রথমেই বলব, আবেগের বশে একদিনে সবকিছু ছেড়ে দিয়ো না। প্রকৃতিকে ভালোবাসা আর প্রকৃতি সংরক্ষণের কঠিন বাস্তবতায় কাজ করা এক বিষয় নয়। আগে কিছুদিন ফিল্ডওয়ার্ক করো, পড়াশোনা করো, অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে কাজ করো এবং স্থানীয় মানুষ ও ইকোসিস্টেমকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করো। নিজের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের পরিকল্পনাও রেখো, কারণ নিজে টিকে থাকতে না পারলে দীর্ঘদিন প্রকৃতির জন্য কাজ করতে পারবে না। খুব বড় কিছু দিয়ে শুরু করতে হবে না; নিজের এলাকার একটি জলাশয়, বন কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাস রক্ষার ছোট উদ্যোগ দিয়েও শুরু করতে পারো। বাধা, হতাশা ও ভুল আসবেই, তাই ধৈর্য ধরে শেখার মানসিকতা রেখো। সবকিছু ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ নয়, যেখানেই থাকো, সেখান থেকেই দায়িত্ব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করাটাই আসল।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা আপনি কোথায় দেখেন আইনের দুর্বল প্রয়োগ, মানুষের জীবিকার চাপ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, নাকি আমাদের প্রকৃতি সম্পর্কে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : আমার মনে হয়, একটি সমস্যাকে আলাদা করে সবচেয়ে বড় বলা কঠিন। আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জীবিকার চাপ এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ সবই বন ও বন্যপ্রাণী ধ্বংসের পেছনে কাজ করছে। এর সঙ্গে বড় সমস্যা হলো বন বিভাগ, প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব ও সমন্বয়ের অভাব। সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক অহং সরিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে আর আইন প্রয়োগের দায়িত্ব শুধু বন বিভাগ বা পুলিশের নয়, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

একই সঙ্গে পরিবর্তনটা শুরু করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে। শিশুদের বোঝাতে হবে, মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়, আমরাও এই ইকোসিস্টেমের একটি অংশ। প্রতিটি গাছ, প্রাণী ও জীবের নিজস্ব গুরুত্ব আছে; তারাও আমাদের মতোই এই পৃথিবীর সৃষ্টি। ছোটবেলা থেকেই বন ও বন্যপ্রাণীর প্রতি এই বোঝাপড়া ও মায়া তৈরি করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে।

প্রশ্ন : পিটাছড়ায় আপনার কাজ যদি আগামীকাল বন্ধ হয়ে যায়, আপনি কীভাবে নিশ্চিত করবেন যে এই বন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না? অর্থাৎ, আপনার উদ্যোগকে ব্যক্তিনির্ভর না রেখে দীর্ঘমেয়াদি করার পরিকল্পনা কী?

মাহফুজ আহমেদ রাসেল : পিটাছড়ার বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী উদ্ধার-পুনর্বাসন, ফ্রি মেডিকেল ক্লিনিক, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সবকিছুই ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে এগুলোকে পিটাছড়া ফাউন্ডেশনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে। চষঁসঢ়ষড়ৎরং ব.ঠ., ইজঅঈ ঐবধষঃয এবং ঢাকার ঐবধষঃযু ঐবধৎঃ ঐধঢ়ঢ়ু খরভব-এর মতো সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি, যাতে উদ্যোগগুলো শুধু আমার ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

দীর্ঘমেয়াদে এখানে একটি আধুনিক আবাসিক ল্যাব ও গবেষণাকেন্দ্র করতে চাই, যেখানে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকরা এক থেকে তিন মাস থেকে উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে ফিল্ডওয়ার্ক ও গবেষণা করতে পারবেন। পাশাপাশি একটি পরিবেশবান্ধব শিক্ষামূলক পর্যটনকেন্দ্র করার পরিকল্পনা আছে যেখানে মানুষ থাকবেন, প্রকৃতি ও ইকোসিস্টেম সম্পর্কে শিখবেন আর সেখান থেকে সংরক্ষণকাজের জন্য একটি টেকসই আয়ও তৈরি হবে। আরও বড় স্বপ্ন হলো, পিটাছড়া থেকে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত পর্যন্ত একটি নিরাপদ বন্যপ্রাণী করিডর তৈরি করা।

এরপরও যদি এমন পরিস্থিতি আসে যে আমাদের পক্ষে কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে বনটি যেন কোনোভাবেই আবার ধ্বংস না হয়, সেজন্য প্রয়োজন হলে সরকারের বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় দেওয়া যেতে পারে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পিটাছড়া আমার নামে থাকল কিনা, সেটা নয়; বনটি যেন দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকে।