আসছে নতুন মুদ্রানীতি

মূল্যস্ফীতির চাপ, দুর্বল বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ এবং ব্যাংকিং খাতে বিপুল অতিরিক্ত তারল্যের মধ্যেই নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) সভায় নীতি সুদহার নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. ফিরদৌসী নাহার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সায়েদ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া কমিটির সদস্য সচিব ও মুদ্রানীতি বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সরকার সভায় উপস্থিত ছিলেন।

মুদ্রানীতি কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দেশীয় ও বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিম্নমুখী রয়েছে। তবে তা এখনো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। সভায় আরও বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখনো অস্থির। এর পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।

এ অবস্থায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অভিঘাতের প্রভাব আরও পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি কমিটি। বিশেষ করে এসব অভিঘাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক (সিপিআই) মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সময়ে নীতি সুদহার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফলে বর্তমানে কার্যকর থাকা ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ রেপো বা নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকছে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছিল। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির হার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির হার রাখা হয় ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।

প্রায় দুই বছর পর গত জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার কমিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা কমেছে, তা সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কতটা পড়ে, সেটিও নজরে রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ কারণে নীতি সুদহার আরও কমানোর পরিবর্তে বর্তমান হার ধরে রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিঘাতের প্রভাব পর্যালোচনা করা হবে।

এদিকে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদার দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এটি খুবই কম প্রবৃদ্ধির হার।

আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ঘোষিতব্য মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের অতিরিক্ত তারল্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান কী থাকে, সেদিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার, আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।

ফলে এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, অতিরিক্ত তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।