নতুন তিন আইনে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ক্ষুণ্ণ হয়েছে

চলতি বছর সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এমন দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, এসব আইনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, নতুন আইনগুলো ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো বাতিল করেছে। ফলে অতীতে ব্যাপকভাবে ঘটে যাওয়া গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আবার ফিরে আসা ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব এবং এর তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করার জন্য নতুন আইন করেছে। সংস্থাটির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হলেও নতুন আইনে সেই দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা আন্তঃসংস্থা তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আটককেন্দ্র, এমনকি গোপন আটককেন্দ্রের সন্দেহ থাকলেও সেগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের যে ক্ষমতা আগের অধ্যাদেশে কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা আর নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। গুমের ঘটনায় কমান্ড দায়বদ্ধতার আইনি মানদণ্ডও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। আগের ব্যবস্থায় কোনো কর্মকর্তা  কোনো লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধ করতে পারতেন এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

পাস হওয়া তৃতীয় আইনটিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের জন্য দায়ী বিশেষায়িত বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে বাহিনীটির শুধু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনকি সাধারণ পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে যে ধরনের সুরক্ষামূলক নিয়ম প্রযোজ্য হয়, এখানে তা-ও রাখা হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘অতীতের সেই ভয়াবহ নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা, যার নির্যাতন ও অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।’ তার মতে, নিরাপত্তা বাহিনীকে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির বাইরে রাখার উদ্যোগ মানুষের আস্থা তৈরিতে সহায়ক নয়।