২০২৭ সালে জিডিপি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে : এডিবি

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমবে বলে আশঙ্কা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে। গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় এই পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দেশগুলো তিনটি প্রধান ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত : মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিস্তার এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি, যা জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থির করে তুলতে  পারে। দ্বিতীয়ত, প্রতিকূল আবহাওয়া (এল নিনো) : ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত শক্তিশালী ‘এল নিনো’ স্থায়ী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা খাদ্য উৎপাদন ও জলবিদ্যুৎ কমিয়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তৃতীয়ত, আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা : এআই-সংক্রান্ত শেয়ারের মূল্যে বড় পতন, শক্ত আর্থিক নীতি এবং বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। বাণিজ্য চাপ, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা এবং বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাবে ২০২৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। দেশে একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও উঁচুতে অবস্থান করতে পারে।

গত জুলাইয়ে এডিবি বাংলাদেশের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ (৪ দশমিক ৫ শতাংশ) জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। সর্বশেষ এডিওতে তার চেয়ে কমে ৪ শতাংশ হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ পর্যন্ত উর্ধ্বসীমায় উঠতে পারে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে জ্বালানি সংকট, কৃষি খাতে বৈরী আবহাওয়ার আঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতার কথা।  

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় এই অঞ্চল সামগ্রিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও একাধিক গভীর অর্থনৈতিক সমস্যা প্রবৃদ্ধির পথ আটকে ধরছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।

বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এশিয়ার অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং তা সরাসরি অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। এডিবির মতে, বিশ্বমানের জ্বালানি অস্থিরতা ও তীব্র এল নিনোর জোড়া ধাক্কায় সামনের দিনগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিম্নগতির বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপর দেশগুলোর চিত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্সের কারণে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এডিবির সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে (যা পূর্বের তুলনায় যথাক্রমে ০ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতের প্রসারের ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিয়েছে।

এডিবি জানায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু বৈশ্বিক সংকটের ওপর নির্ভর করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা একে আরও জটিল করে তুলেছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নীতিমালার ধীর বাস্তবায়ন এবং রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন বাধা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং নিজস্ব সংকট উত্তরণে বাংলাদেশকে দ্রুত আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী জোরদার করার দিকে নজর দিতে হবে। নতুবা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয় ক্ষেত্রেই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এডিবি জানায়, আগামী অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত মূলত প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সত্ত্বেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, যা বেসরকারি ভোগ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং উচ্চতর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে মিলে বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।

তবে উচ্চ ঋণগ্রহণের ব্যয়, ঋণের সীমিত প্রাপ্যতা, জ্বালানি ঘাটতি ও দুর্বল বাহ্যিক চাহিদার কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি তেলের উচ্চমূল্য, বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলে বিঘœ, ব্যাংকিং খাতে চাপ, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব এবং জলবায়ু সংক্রান্ত ধাক্কা দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি (ডাউনসাইড রিস্ক) তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিয়াংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হতে শুরু করলেও এটি এখনও বাহ্যিক ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কাছে অরক্ষিত।

তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কার ত্বরান্বিত করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে এসব সংস্কার অপরিহার্য।’