ফিডের বাড়তি দামে চাপে পোলট্রি খামারিরা

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির পোলট্রি খামারি মো. মোমিনুল প্রতি মাসে ব্রয়লার মুরগির জন্য ৭০ বস্তা খাবার কিনতেন। দুই দফায় ফিডের দাম বাড়ার পর এখন আর সেই পরিমাণ খাবার দিতে পারছেন না, কমিয়ে ৬০ বস্তা খাবার দিচ্ছেন। এতে মুরগির কাক্সিক্ষত ওজন হচ্ছে না, বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন না। লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

মোমিনুল ইসলামের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা। ফিডের দাম বাড়ার পাশাপাশি গত কয়েক মাসে ওষুধ, ভ্যাকসিন, পরিচালন ব্যয়সহ অন্য উৎপাদন উপকরণের দামও বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ডিম ও মুরগির দাম সব সময় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছেন।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফিড তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর প্রায় সব কটির দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম বর্তমানে কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা। এক মাস আগে ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্রান) দাম ২৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩ টাকা। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা। আর সয়াবিন মিলের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে।

ফিড উৎপাদনে ব্যবহৃত অন্য প্রোটিন উৎসের দামও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এর সঙ্গে মুদ্রাবাজারে, বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণেও আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে পরিবর্তন হচ্ছে। ভুট্টার বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের মৌসুমে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮ থেকে ২৯ টাকায় পাওয়া গেলেও জুন, জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম প্রতি টন ২৩৫ থেকে ২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে।

ফিডের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফিডের দামে। আর ফিডের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশু উৎপাদনের খরচও।

পোলট্রি ও গবাদিপশুর ফিডের দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানসম্মত ফিড তৈরির মোট খরচের প্রায় ৮০ ভাগই কাঁচামাল কেনায় ব্যয় হয়। ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্রান ও ডিওআরবির মতো মৌলিক উপাদানের দাম স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে ফিড মিলগুলোর পক্ষে আগের দামে ফিড বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে কাঁচামালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও ফিডের দাম বেড়ে যায়। আবার গ্যাস বিদ্যুতের দামের প্রভাবও পড়ছে ফিড উৎপাদনে।

বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। তবে ব্রান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের প্রাণিজ খাদ্য বিক্রেতা সলিম উল্যাহ বলেন, ভুট্টার দাম বাড়ায় সব ধরনের ফিডের দাম বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে ফিড উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বেশি দামে ফিড কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ায় ক্রেতা কিনছে কম।

ফিডের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পথে নেমেছেন খামারিরা। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর কমানো এবং ডিম-মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ আগে দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারির উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ডিম-মুরগির দামও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।