আব্দুস ছামাদের বয়স ৭০ বছর। নদীভাঙনে হারিয়েছেন সব। গত দুই বছরে তার বসতবাড়ি ভেঙেছে ৫ বার। আজ এখানে তো কাল সেখানে, এভাবে চলছে তার দিনলিপি। দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তিস্তা নদী হামার সব কাড়ি নিছে। হামাক একেবারে নিঃস্ব করি ছাড়িল। বাপ-দাদার থুইয়া যাওয়া সহায়-সম্পত্তি যা কিছু আছিল, নদীরভাঙনে সব শ্যাষ। দুই বছরে পাঁচ বার ভাঙন। আমি এলা নিঃস্ব হয়া গেছি।’
সরেজমিন গত মঙ্গলবার কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দক্ষিণ দলদলিয়া গ্রামে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বাতেন (৬৫) বলেন, ‘আইতোত ভাঙন শুরু হইছে দিনের ১২টা নাগাদ। মোর বাড়িটা নদীতে চলি গেল। খালি ২টা ঘর ভাঙ্গি সরাইছি। আর কিছুই বাচপার পাই নাই। এখন অন্য গ্রামে একজনের বাড়িতে আশ্রয় নিছি। আগে আছিনো গিরস্থ, এখন হইলাম নদীভাঙা মানুষ।’
আব্দুস ছামাদ ও আব্দুল বাতেনের মতো বাড়িঘর হারিয়ে দিশেহারা তৈয়ব আলী (৬৫), জহুরুল হক (৬০), রফিকুল ইসলাম (৫০), মফিজল হক (৬২), জাকির হোসেন (৫০), বজরুল হক (৬৪) ও ফজলুল হক (৫৫)। এলাকা ছেড়ে পরিবার নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, এলাকার হিন্দুপাড়া, ডাক্তারপাড়া, মাঝিপাড়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামে অব্যাহত ভাঙনে চলতি মাসে অন্তত ২০টি বাড়ি তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনে আশ্রয়হীন হয়েছে আরও ২৫টি পরিবার। গত সাত দিন ধরে দক্ষিণ দলদলিয়া লাল মসজিদ পাড় এলাকায় ভাঙনে ১০টি পরিবারের বাড়িঘর, গাছপালা, ৫০ একর আবাদি জমি ও অর্ধকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে দক্ষিণ দলদলিয়া, গোড়াই পিয়ার গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার। নালারচর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লাল মসজিদ ও বাঁধের রাস্তাও রয়েছে ঝুঁকিতে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা না পেয়ে ভুক্তভোগী মানুষজন নদীতীরে গাছ ও বাঁশ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আরও জানায়, স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার মাহবুবুব আলম ছালেহী ভাঙন রোধে ৫ হাজার জিও ব্যাগ চেয়ে ডিও লেটার দিলেও তা বরাদ্দ দিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেখানকার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার থেকে জিও ব্যাগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। ফলে তারা নিরুপায়। এ কারণে ওই স্থানের নদী ভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
নালারচর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়টি নদীর কাছাকাছি হওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদ্যালয়টি ভেঙে গেলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোথায় যাব সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’
দলদলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বলেন, ‘বরাদ্দ না এলে ইউনিয়ন পরিষদের কিছুই করার থাকে না। আমি ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেছি। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোডর্কে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য অনুরোধ করেছি।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ওই এলাকার ভাঙন রোধের জন্য জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাইনি। এদিকে জেলার বরাদ্দ শেষ হওয়ায় বিপদে পড়েছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যও জিও ব্যাগের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (্ইউএনও) এটিএম আরিফ বলেন, ‘ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জিও ব্যাগের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলেছি। তারা চেষ্টা করছে। জিও ব্যাগ না ফেলালে এত বড় লোকালয় রক্ষা করা যাবে না।’