চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্রে রূপ দিতে নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পে সরকারের সিংহভাগ অর্থায়ন থাকলেও বেশ কিছু অংশ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব মাহমুদুল ইসলাম খান গত ১৬ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরকে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটিকে সংস্থাটির 'ইন্টেগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট' (আইজিএনডি) শীর্ষক উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এডিবি'র ভাষ্য, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা দূর করে চট্টগ্রামকে কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন গেটওয়েতে পরিণত করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে বড় যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত উড়োজাহাজ ওঠানামা, আধুনিক পণ্য ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক, রেল ও এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন হয়েছিল ৯ লাখ ৭৭ হাজার। ২০২৫ সালেও সেই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল। পণ্য পরিবহনেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি পণ্য ঢাকায় নিয়ে সেখান থেকে উড়োজাহাজে বিদেশে পাঠাতে হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক গত ১৫ আগস্ট অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চিঠি দিয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
জানা গেছে, বর্তমানে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার এবং প্রস্থ ৪৫ মিটার, যা নতুন প্রকল্পে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করতে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হতে পারে। একই সঙ্গে সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে, দ্রুত বের হওয়ার ট্যাক্সিওয়ে, বড় উড়োজাহাজের জন্য ছয় থেকে আটটি পার্কিং স্ট্যান্ড এবং প্রায় ছয়টি বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাস করে প্রথম ধাপে বছরে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেড় কোটি থেকে ২ কোটি পর্যন্ত করা হবে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে বছরে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টনে উন্নীত করা হবে। প্রস্তাবিত কার্গো হাবে বন্ডেড গুদাম, এক্সপ্রেস কার্গো, ই-কমার্স সুবিধা, হিমাগার ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থাসম্পন্ন। প্রকল্পে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক সংযোগকারী যাত্রী পরিসেবা, বড় আকারের যাত্রীবাহী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা, বিমানের দ্রুত ও দক্ষ টার্ন অ্যারাউন্ড, বর্ধিত কার্গো হ্যান্ডলিং ও কোল্ড চেইন হাব স্থাপন, সড়ক, রেল ও এক্সপ্রেসওয়ের সমন্বিত মাল্টিমোডাল সংযোগ সুবিধা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে একটি কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ আছিফ চৌধুরী আমাদের সমন্বয়ক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, শাহ আমানতকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করতে হলে বড় বাজেট হাতে নিতে হবে। আমাদের লাউঞ্জ সুবিধা, চেকিং কাউন্টার সুবিধা, কার্গো ভিলেজ সুবিধা বাড়াতে হবে। এখন কেবল রপ্তানি হয়, আমদানি হয় না। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে ফুয়েল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পূর্বদিকের বিশেষ করে চীন, কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনামের উড়োজাহাজগুলো যখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যায়, তখন এসব উড়োজাহাজ চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সচল থাকে। এটিকে ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।’