চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের বাসিন্দা আমায়রা হোসেনের (৩) ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চলছিল তার চিকিৎসা। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলেন। কিন্তু রাতভর চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচটি বেসরকারি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘুরেও কোনো শয্যা খালি পায়নি শিশুটির বাবা-মা। নিরুপায় হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ারে বসিয়েই শুরু হয় তার চিকিৎসা।
চট্টগ্রাম নগরীর হাসপাতালগুলোতে যখন শয্যাসংকটের এই অবস্থা, তখন একেবারেই ভিন্ন চিত্র ৫০ শয্যার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালের। হাসপাতালে জনবল ৬৪ জন থাকলেও প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগী আসেন গড়ে ৩৯ জন। সবই বহির্বিভাগের। ৫০ শয্যার বিশাল ইনডোরে ভর্তি আছেন মাত্র ১ জন রোগী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর কোনো সেবা না থাকায় এটি সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। হাসপাতাল থেকেই রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। বিকেলের
পর হাসপাতাল কার্যত বন্ধই থাকে। সামান্য কাটাছেঁড়ার চিকিৎসাও অনেকক্ষেত্রে এখানে দেওয়া হয় না। আন্দরকিল্লার জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট আলকরণ এলাকায় এই হাসপাতালে সরেজমিনে যায়, সাততলার বিশাল ভবন। কক্ষে কক্ষে এসি-ফ্যান। ভবনজুড়ে দুইটি লিফট। আছে জেনারেটর। টাইলস করা মেঝে, পরিপাটি বিছানা আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশাল বহর; সবই আছে। শুধু নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা আর রোগী।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত হাসপাতালটি স্থানীয়ভাবে মেনন হাসপাতাল-২ নামে পরিচিত। এখানে ২৪ ঘণ্টার সেবার বদলে কার্যক্রম চলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ভবনজুড়ে বিরাজ করছে এক ধরনের শূন্যতা ও ভুতুড়ে পরিবেশ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, গেল আগস্ট মাসে হাসপাতালটি থেকে মোট ১ হাজার ১৮১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে মাত্র ৮ জন ছাড়া বাকি ১ হাজার ১৭৩ জনই চিকিৎসা নিয়েছেন আউটডোরে। সে হিসাবে দৈনিক গড়ে রোগী এসেছেন প্রায় ৩৯ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট মাসে আসা রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৮৪ জন ছিলেন দন্ত বিভাগের এবং ৩১১ জন এসেছিলেন জলাতঙ্ক বা বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ের ভ্যাকসিন নিতে। এ ছাড়া সাধারণ রোগী ২০৭ জন, চোখের রোগী ৭৬ জন, শিশু রোগী ৬৮ জন এবং গাইনি রোগী ছিলেন ২৭ জন। রোগীরা মূলত দন্ত, চক্ষু, গাইনি, মেডিসিন, শিশু ও প্রাণীর কামড়ের প্রতিষেধক নিতেই আসেন।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন মাত্র ৬ জন। এর মধ্যে ১ জন ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়ই বাইরে থাকেন। বাকি ৫ জনের মধ্যে ৩ জন মেডিকেল অফিসার, ১ জন শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ১ জন চোখের কনসালট্যান্ট। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুপুরের পর থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক থাকেন না। ছুটির দিনে সেবাকার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নারের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিদিন ৩২ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে গড়ে রোগী ভর্তি থাকে ৭০ থেকে ৮০ জন। একই অবস্থা নগরীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালেরও। সেখানেও ১২ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকে ২০ থেকে ২৫ জন।
চট্টগ্রাম চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর অস্বাভাবিক চাপ। শয্যার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে। চসিকের জেনারেল হাসপাতাল বা অন্য কোনো হাসপাতালকে ডেঙ্গুর জন্য ডেডিকেটেড করলে রোগীরা আরও ভালো সেবা পেত।
ভুতুড়ে ভবন, খসে পড়ছে সিলিং : চসিক জেনারেল হাসপাতাল ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, এর নিচ তলা আর দ্বিতীয় তলায় কোনোমতে আউটডোর কার্যক্রম চলে। তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার ও সম্প্রতি চালু হওয়া ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেল। চতুর্থ ও পঞ্চম তলাজুড়ে রয়েছে কেবিন। তবে চতুর্থ তলার সবকটি কক্ষই তালাবদ্ধ। ভেতরে সিলিং খসে খসে পড়ছে, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে কেবিনের দামি সব আসবাবপত্র।
বাসা বেঁধেছে কবুতরসহ বিভিন্ন প্রাণী। তলাজুড়ে এক ভুতুড়ে নীরবতা। পঞ্চম তলার চিত্রও প্রায় একই, তবে সেখানকার ৫১৩ নম্বর কক্ষে ১ জন রোগীকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখা গেছে। এ ছাড়া ষষ্ঠ তলায় সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং সপ্তম তলাটি পরিত্যক্ত।
গত সোম ও মঙ্গলবার দুপুর একটার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালে পাঁচ থেকে ছয়জন রোগীকে আসতে দেখা গেলেও তাদের কেউ এসেছিলেন বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে, আবার কেউ এসেছিলেন পরীক্ষার ফলাফল নিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও অধিকাংশ নষ্ট। অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে রোগীর বদলে কর্মকর্তাদের আনা-নেওয়া করা হয়। দুটি লিফটের একটি নষ্ট এবং সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কেবল দ্বিতীয় তলায়।
জনবলের বহর : চিকিৎসা কার্যক্রম না চললেও হাসপাতালে জনবলের কোনো ঘাটতি নেই। চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ২২টি পদের বিপরীতে মোট ৬৪ জন নিয়োজিত আছেন। এই বিশাল জনবলের বেতন খাতে প্রতি মাসে চসিকের খরচ হয় প্রায় ১৪ লাখ টাকা। অথচ হাসপাতালটি থেকে মাসে আয় মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।
উদ্বোধনের পরও ফাঁকা ‘ডেঙ্গু সেল’ : ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য গত ১৪ সেপ্টেম্বর সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতালের তিন তলায় ১৫ শয্যার ‘ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেল’ উদ্বোধন করেন। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, শয্যাগুলোর একটিতেও রোগী নেই। ডেঙ্গু সেলে দায়িত্বে থাকা নার্স ও কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন।
রোগী না আসার কারণ ও স্থানীয়দের ক্ষোভ : হাসপাতালের আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, কার্যকর কোনো সেবা না থাকায় এটি সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। হাসপাতাল থেকেই রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না।
হাসপাতালের পাশের একটি মোটর পার্টস দোকানের ম্যানেজার মো. আরিফ বলেন, এটাকে কখনো হাসপাতালের মতো মনে হয় না। দুই বছরে ১০ জনের মতো রোগী যেতে দেখেছি।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, এখানে কোনো চিকিৎসা নেই। সামান্য মাথা ফাটার মতো ঘটনা ঘটলেও বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গৃহিণী রহিমা বেগম জানান, ডেলিভারি, আলট্রাসনোগ্রাফি, এক্স-রে বা ইসিজি; কোনো পরীক্ষাই এখানে হয় না। সামান্য রক্ত পরীক্ষার জন্য বাইরের ল্যাবে যেতে হয়। অন্য বাসিন্দা মো. রাহাত হোসেন জানান, সন্ধ্যা ৬টার পর দরজা বন্ধ হয়ে যায়, চিকিৎসক থাকেন না, এমনকি সেলাই করলেও টাকা নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে হাসপাতালের অন্তত তিনজন কর্মচারী বলেন, এই হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও ১০০ শয্যার সেবা দেওয়ার মতো জনবল আছে। বিকেলের পর ডাক্তার থাকে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক। চার ও পাঁচ তলায় যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারবে বহিরাগতরা। অনেকেই বাইরে চাকরি করেন। তারা বলেন, কয়েকজন চিকিৎসক নিয়োগ দিলে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর পরিপূর্ণ সেবা দেওয়া সম্ভব।
সার্বিক বিষয় জানতে সোমবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে ইনচার্জ ডা. হোসনে আরা বেগমকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল থেকে জানানে হয় তিনি পাশের মেনন-১ হাসপাতালে আছেন। তবে সেখানে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে কল দিলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরদিন তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষার পর তাকে হাসপাতালে আসতে দেখা যায়। মন্তব্যের জন্য সাক্ষাৎ চাইলে তিনি অসুস্থ বলে জানান তার সহকারী।
চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমাম হোসেন রানা বলেন, বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই হাসপাতালে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটিকে কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে বেসরকারি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। মেয়র মহোদয়েরও বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা হাসপাতালটিকে ডেঙ্গুর জন্য বিশেষায়িত করেছি। সেখানে ১৫ শয্যা ডেঙ্গুর জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমরা নগরবাসীকে বলব, আপনারা হাসপাতালে গিয়ে সেবা নেন।